অস্ট্রেলিয়ার বিশেষ শিশু কাডেন এখন ‘তারকা’

A+ A- No icon

শারীরিক গঠন আর দশটা শিশুর মতো নয় বলে স্কুলে সহপাঠীরা খুব খ্যাপাতো তাকে। এই নিয়ে মনের কষ্টে আত্মহত্যা করতে চাচ্ছিল শিশুটি। মায়ের সামনে কেঁদে কেঁদে বারবার বলছিল, ‘আমাকে একটা দড়ি এনে দাও। গলায় ফাঁস দিয়ে মরব।’ গত সপ্তাহের এই হৃদয়বিদারক ভিডিওটি ঝড় তোলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। শিশুটির চোখের পানিতে আবেগাপ্লুত হয়েছেন বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ। তাকে সাহস দিতে পাশে দাঁড়িয়েছেন হিউ জ্যাকম্যান, ল্যাট্রেল মিশেলের মতো অজি তারকারা।


কাডেনের জন্য জনপ্রিয় অভিনেতা হিউ জ্যাকম্যান টুইটারে একটি ভিডিওবার্তা পোস্ট করেছেন। এতে তিনি বলেন, ‘কাডেন, নিজেকে যা ভাবো তুমি তার চেয়েও বেশি শক্তিশালী।’ সবাইকে বুলিং বন্ধের আহ্বান জানিয়ে উলভারিনখ্যাত এই তারকা বলেন, ‘দয়া করে সবাই সবার প্রতি দয়ালু হই। বুলিং ঠিক নয়।’ কাডেনকে সাহস জুগিয়ে জ্যাকম্যান বলেন, ‘যা-ই ঘটুক না কেন, তুমি আমাকে বন্ধু হিসেবে পাবে।’


কাডেনের কান্নার ভিডিও প্রকাশের পরপরই অস্ট্রেলিয়ার রাগবি অ্যাসোসিয়েশন সিদ্ধান্ত নেয় তারা শিশুটির পাশে দাঁড়াবে। যোগাযোগ করা হয় পরিবারের সঙ্গে। স্থানীয় রাগবি দল অল স্টারসের সঙ্গে নিউজিল্যান্ডের মাওরি দলের প্রীতি ম্যাচ ছিল। সেখানে ম্যাচ শুরুর আগে অল স্টারসের অধিনায়ক ল্যাট্রেল মিশেলের হাত ধরে বল নিয়ে মাঠে নামে শিশু কাডেন। এসময় স্টেডিয়ামের হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানান তাকে। পরে মাঠে বসেই দুই দলের জমজমাট লড়াই উপভোগ করে শিশুটি। সবার এমন ব্যবহারে এবার আর কান্না নয়, হাসির ঝিলিক দেখা গেছে কাডেনের চোখে-মুখে।


গত বুধবার কাডেনকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন তার মা ইয়াররাকা বেইলিস। স্কুল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে বসার পর থেকেই ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে ওই শিশুটি। কী হয়েছে জানতে চাওয়ায় বেড়ে যায় কান্না। ফোঁপাতে ফোঁপাতেই মাকে জানায়, আর বাঁচতে চায় না সে। ছেলের মুখে এমন কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ইয়াররাকা। বুঝতে পারছিলেন, খারাপ কিছু একটা হয়েছে তার সন্তানের সঙ্গে। ফের জিজ্ঞেস করতেই কাডেন কাঁদতে কাঁদতে জানায় দিনের পর দিন স্কুলে ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা।


বামনত্বের শিকার নয় বছরের শিশু কাডেন। তাই বয়স বাড়লেও অন্যদের তুলনায় উচ্চতা বাড়েনি, চেহারাতেও কিছুটা বয়স্ক ভাব। এ নিয়েই স্কুলে প্রতিদিন বুলিংয়ের শিকার হয় সে, ধেয়ে আসে নানা তির্যক মন্তব্য। তাকে দেখলেই সবাই হাসাহাসি করে। শিশুমন এসব আর কতদিন সহ্য করতে পারে। তাই নিজেকে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় সে। কাডেনের ধারণা, মরে গেলেই আর মানুষের ঠাট্টা-বিদ্রুপের শিকার হতে হবে না। আর সবার সামনে অপমানিত হতে হবে না। ছেলের এই কষ্টের কথা ক্যামেরাবন্দি করে তা ফেসবুকে ছেড়ে দেন অসহায় মা। তিনি চান, বিদ্রুপের শিকার হয়ে আর কোনো শিশু যেন জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে না ফেলে। ভিডিওটি একটি প্রাইভেটকারে ধারণ করা। এতে আরও দেখা যায়, শিশুটি সিটে মুখ গুঁজে অনবরত কেঁদে যাচ্ছে। তার চোখে-মুখে অসহায়ত্বের ছাপ। আর তার মা কান্নাজড়িত কণ্ঠে শিশুটির ওপর বিদ্রুপের বিরূপ প্রভাব তুলে ধরছেন।


ছয় মিনিটের ভিডিও ক্লিপটিতে কাডেনকে বলতে শোনা যায়, ‘আমাকে একটা দড়ি এনে দাও। আমি নিজেকে শেষ করে দেবো... আমি শুধু আমার বুকে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে চাই... আমি চাই, কেউ আমাকে মেরে ফেলুক।’ এসময় তার মা ইয়াররাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমি বিষয়টিকে আর চেপে রাখতে পারলাম না। আমি এইমাত্র ছেলেটিকে স্কুল থেকে নিয়ে এলাম এবং দেখলাম তাকে কীভাবে অপমান করা হচ্ছে। আমি বিষয়টি প্রিন্সিপালকে জানিয়েছি। আমি সমাজের লোকদের জানাতে চাই, এরকম সামাজিক পীড়ন জীবনে কতটা প্রভাব ফেলে। আমার ছেলেকে তো দেখছেনই।’


ব্রিসবেনের বাসিন্দা এই নারী বলেন, ‘দয়া করে আপনাদের শিশুদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিন, আপনার পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধবদের এ বিষয়ে শিক্ষা দিন। কারণ, তাদের মাধ্যমেই একেকজন একেকভাবে আমার ছেলের মতো অপমানের শিকার হবে। এখন আপনারা বুঝতে পারছেন, এসব অবুঝ শিশুরা নিজেদের কেন শেষ করে দিচ্ছে।’ এ ঘটনার পর ওই শিশুটির জন্য তহবিল গঠন হয়েছে। গোফান্ডমি নামে একটি সাইটে তার জন্য ১০ হাজার ডলার সংগ্রহের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছিল। এরই মধ্যে সেখানে সাড়ে চার লাখেরও বেশি ডলার জমা হয়েছে ও এর পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে। সবার একটাই উদ্দেশ্য, ভালো থাকুক কাডেন, ভালো থাকুক বিশেষ শিশুরা।

Comment As:

Comment (0)