কাশ্মীর সংকট

A+ A- No icon

ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ তুলে নেওয়ার ফলে জম্মু ও কাশ্মীর অন্য যেকোনো ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে যেটুকু বেশি স্বায়ত্তশাসন ভোগ করত, তা আর পাবে না। হোক তা কাগজে কলমে, এবার তার চিরস্থায়ী অবসান ঘটল। ভারত সরকারের এমন সিদ্ধান্ত ও সেখানে ব্যাপকমাত্রায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ানোর ফলে চারদিকে কাশ্মীর নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কাশ্মীরের এমন পরিস্থিতি নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস বিষয়ের গবেষক ও লেখক আলতাফ পারভেজ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।


ভারতের সংবিধানের ‘৩৭০ অনুচ্ছেদ’ রহিতকরণের জন্য এই সময়টাকেই উপযোগী মনে করলেন কেন মোদি-অমিত জুটি? এর পেছনে বিজেপির উদ্দেশ্যটা আসলে কী?


আলতাফ পারভেজ : আমার বিবেচনায় এই অধ্যায়ে মোদি-অমিত জুটির চেয়েও বেশি কাজ করেছে অমিত শাহ-আরএসএস জুটি। মোদি নিজেও আরএসএস প্রতিনিধি বটে। কিন্তু কাশ্মীর ইস্যুতে আরএসএসের সবচেয়ে উগ্রবাদী অংশ মোদিকে কোনোরূপ বিকল্প বাছাইয়ের সুযোগ দিতে চায়নি। দুটো কারণে এই সময়টা বেছে নেওয়া হয়েছে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই তালেবানের সঙ্গে চুক্তি করতে যাচ্ছে আফগানিস্তান নিয়ে। এতে ভারতের একদম সায় নেই। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। ভারত এর উত্তর দিল কাশ্মীরকে ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’ ঘোষণা করে। দ্বিতীয়ত অমিত শাহ সরকারের নতুন মেয়াদের শুরুতেই জনপ্রিয়তা জমজমাট অবস্থায় থাকাবস্থায় মোদিকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দিচ্ছেন, যাতে মধ্যপন্থী অবস্থানের কোনো সুযোগ না থাকে। ক্রমে ভারত ‘হিন্দুরাষ্ট্র’ হিসেবে ঘোষণার পথে অগ্রসর হতে পারে বলে অনেক ভারতীয় রাজনৈতিক ভাষ্যকার আশঙ্কা করছেন। এর জন্য এর চেয়ে আর ভালো কোনো সময় হতে পারে না। এর মধ্য দিয়ে সেখানে বিশেষভাবে কংগ্রেসের রাজনীতি শেষ হয়ে যাবে। বাবরি মসজিদের রায়ের পরই হয়তো ওই ইস্যুটি সামনে আসবে।


৩৭০ অনুচ্ছেদ প্রত্যাহারের পেছনে বিজেপির যুক্তিগুলো আসলে কতটুকু যৌক্তিক? বিজেপির দাবি, এবার কাশ্মীরে উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থান হবে, বৈষম্য কমবে। এ বিষয়ে আপনি কী মনে করেন?


আলতাফ পারভেজ : আসলে ‘অনুচ্ছেদ ৩৭০’ এক অর্থে একটা কাগুজে বিষয়ই ছিল। এর বাস্তব মর্যাদা অনেক আগেই লুণ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। ‘৩৫-ক’-এর কিছু বাস্তব কার্যকারিতা ছিল। তবে মোদি সরকার এইসব সাংবিধানিক স্বাতন্ত্র্য বাতিলের পক্ষে যেসব যুক্তি দেখাচ্ছে, তার একটিও সত্য নয়। এসব অনুচ্ছেদের কারণে কাশ্মীরের উন্নয়ন আটকে ছিল, এমন দাবি হাস্যকর। কাশ্মীরের উন্নয়নের প্রধান শর্ত হলো সেখানে সামরিকায়নের অবসান, স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং জনগণকে রুটিরুজির কাজে স্বাভাবিক সুযোগ দেওয়া। আরএসএস-বিজেপি সরকার গত পাঁচ বছর সেখানে ঠিক উল্টো নীতি নিয়েছিল। কোনো কারণ ছাড়াই সেখানে গত বছর থেকে রাষ্ট্রপতির শাসন চলছিল।


ভারতের আরো বহু রাজ্যে সাংবিধানিক বিভিন্ন স্বাতন্ত্র্য রয়েছে, বিশেষ করে উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে। মোদি সরকার কোনোদিনই সেগুলোতে হাত দিতে পারবে না। মূলত মুসলমানপ্রধান জনপদ বলেই কাশ্মীরের এই দশা। কাশ্মীরের উন্নয়ন কাশ্মীরিরা নিজেরাই করতে সক্ষম। সেটার দায়িত্ব তো ভারতীয়দের নয়। কাশ্মীর যে শর্তে ভারত ইউনিয়নে যুক্ত হয়েছিল সেখানে বৈদেশিক শর্ত, প্রতিরক্ষা ও মুদ্রা ব্যবস্থা ছাড়া অন্যান্য বিষয় তো ভারতীয়দের দেখার কথা নয়। উপরন্তু এত দমনপীড়নের পরও মানব উন্নয়ন সূচকে বহু ভারতীয় রাজ্যের চেয়ে জম্মু ও কাশ্মীর এগিয়ে ছিল।


কাশ্মীরের মানুষের বিভিন্ন ধরনের শঙ্কা রয়েছে, সেগুলো কতটুকু যৌক্তিক?


আলতাফ পারভেজ : কাশ্মীরের মানুষ এ মুহূর্তে চরমভাবে শোকগ্রস্ত। তাদের সম্পূর্ণ ইতিহাস কেউ যেন একমুহূর্তের ঘোষণায় ছিনতাই করেছে—এ রকম একটা বেদনার মেঘ পুরো ভ্যালিজুড়ে এখন। কাশ্মীরে সামগ্রিক অনুভূতি এখন ধর্ষিত হওয়ার অনুভূতি। ওরা আসলে জায়গা-জমির বিষয় নিয়ে খুব বেশি ভাবছে না। কারণ, তার চেয়ে বড় কিছু তাদের লুণ্ঠিত হয়েছে। তবে কাশ্মীরে জনমিতি পরিবর্তনের চেষ্টা ও ভূ-সম্পদ হস্তগত করার চেষ্টা সফল হবে বলে আমার মনে হয় না। কারণ কাশ্মীর নেপাল, ভুটান, সিকিম নয়; বেসামরিক ইস্যুতে সেখানে মাঠ পর্যায়ে যা ইচ্ছা তা করা যায় না। ভারতের পক্ষে অত পছন্দসই মানুষ সেখানে পাওয়া যাবে না। বরং ওই রকম ঘটনাগুলো ঘটতে থাকবে লাদাখ ও জম্মুতে। সেখানে মুসলমানদের উচ্ছেদ ঘটবে বেশি। কাশ্মীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে মূলত টার্গেট করা হবে তাদের ভূ-সম্পদের প্রতি। আমার মনে হয়, জনমিতির পরিবর্তন ঘটানো হবে আগে জম্মুতে। জম্মুর মুসলমানদের শঙ্কাটি আগে সত্য হবে। তাদের উদ্বাস্তু হতে হবে ক্রমাগত। লাদাখে বৌদ্ধদের সঙ্গে স্থানীয় মুসলমানদেরও সম্পর্কের অবনতি ঘটানো হবে।


কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ কী? দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে যাবে নাকি আরো নীরব হয়ে যাবে?


আলতাফ পারভেজ : অবশ্যই এ অঞ্চলের ভবিষ্যৎ খারাপ। প্রাথমিকভাবে হয়তো কিছুদিন সামরিক বাহিনী দমন ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শান্ত পরিস্থিতি দেখানো যাবে। কিন্তু পুরো এলাকা কিছুদিন পরই সংঘাতমুখর হয়ে পড়তে পারে। কাশ্মীরের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি সহিংসতার ইঙ্গিতবহ। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ছেড়ে গেলে এই অঞ্চলের প্রতি বৈশ্বিক মনোযোগও কমে যাবে। এই সুযোগে এখানে দীর্ঘস্থায়ী একটা সহিংস পরিবেশ তৈরি হয়ে যেতে পারে।


কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের প্রভাব কি পুরো উপমহাদেশে পড়বে?


আলতাফ পারভেজ : এই প্রভাবটি ইতোমধ্যে পড়ছে। তবে আমার বিবেচনায় এটা মুখ্যত পড়বে সামাজিক পরিসরে, আন্তসাম্প্রদায়িক স্তরে। বিজেপি-আরএসএস পরিবার তাদের সর্বশেষ পদক্ষেপের মাধ্যমে উপমহাদেশের আন্তসাম্প্রদায়িক সম্পর্ককে এমন এক চূড়ান্ত অবিশ্বাসের দিকে নিয়ে গেছে, তা ক্রমে আরো বাড়বে। এর একটা সামরিক অভিব্যাক্তি হিসেবে পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ককে যদি আমরা বিবেচনা করি, তাহলে আমার বিবেচনায় সেটা বেশি খারাপ হবে না। পাকিস্তান আপাতত ভারতের সঙ্গে কোনো বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে যাবে না। এখন এই দুই দেশের মূল প্রতিযোগিতা হবে আফগানিস্তানে। সেখানে কে দ্রুত প্রাধান্য বিস্তার করছে, তার ওপর নির্ভর করবে কাশ্মীর পরিস্থিতি।

Comment As:

Comment (0)