ঢাকায় আর্টের ক্রিটিসিজম বলে কিছু নাই: মনিরুল ইসলাম

A+ A- No icon

প্রশ্ন: আপনার স্পেশালাইজড ফরম নিয়ে আলাপ করতে চাই, বিশেষ করে এচিংয়ে ‘মনিরোর স্কুল’ বলে যে ধারা আপনি স্পেনে প্রবর্তন করেছেন সেটার আদ্যোপান্ত জানতে চাই।


মনিরুল ইসলাম: ১৯৬৯ সালে স্পেন সরকারের স্কলারশিপ পেলাম। তখন তো পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের কোনও ভেদাভেদ ছিল না; একমাত্র গভার্মেন্ট হাউজ ছাড়া। ৬৯ সালের অক্টোবর মাসের ঘটনা। সত্তর থেকে দুই পাকি​স্তানে (পূর্ব​ ও পশ্চিম)​ দামামা বাজতে লাগল। যাক​ ​ওই অবস্থায় একটা স্কলারশিপ! সরকারি স্কলারশিপ ছিল এটা, নট মেরিট। ডিপলোমেসিক স্কলারশিপ। পাকিস্তানের সঙ্গে স্পেনের সঙ্গে কালচারাল বিনিময় আরকি। ৯ মাসের জন্য এটা ছিল। ঐ সময়ে স্কলারশিপ পাওয়াটা আসলে খুব কঠিন ছিল। রফিকুন নবী ছিলেন আমার সিনিয়র শিক্ষক। বয়সে চার মাসের ছোট তিনি। কিন্তু একাডেমিকভাবে তিনি আমার সিনিয়র। আসলে মেট্রিক ফেল করেছিলাম। কাছের কিছু মানুষ না থাকলে আমি হয়তো তিনবার মেট্রিক ফেল করতাম। ৫৮-এ মেট্রিক​ দিলাম।​ ফেল করলাম। আন​অ্যালাউড হলাম। হেড স্যার বললেন, ডিজঅ্যালাউ তো হোসনি। এটা হলো বিপদ হতো।


জীবনানন্দ দাশের একটা লাইন আছে, ‌‘জীবনের গভীরতম বেদনার মধুরতম প্রকাশের নামই হলো আনন্দ।তখন (স্কুলের সময়) খুব ক্রশিয়াল সময় ছিল। ​​সাজেশনের জন্য​ ​​সবাই বলত, ‘ওকে ধর​,​ ওকে ধর’। ​তারপর পরীক্ষায় নকল করতাম। এমনও হয়েছে, ৩০টি রচনা পকেটে করে নিয়ে গিয়েছি​;​ একটাও কমন পড়েনি। কলমে গায়ে সুঁই দিয়ে নকল করতাম। সে এক কঠিন বিষয়! লাইফ একটা অন্যরকম বিষয়​,​ মানুষের জন্য। এক সেকেন্ডর জন্য​​ ​ পুরো ক্যারিয়ার ১৮০ ডিগ্রি চেঞ্জ হয়ে যেতে পারে। সেটা আমার হয়েছে। আমি টিচার ছিলাম। রফিকুন নবী আমার সিনিয়র টিচার। একদিন করিডোরে হাঁটছি। বললেন, ‌‘ওই মনির​,​ যাবা নাকি স্পেনে?’ আমি ভেবেছিলাম ফান। বললাম, ‘আপনি যান না!’ বললেন, ‘দেখ না, ১৫ বছর ধরে শুধু ফরমই লিখছি।’ আর একটা বিষয় সেসময়টাতে যত স্কলারশিপ হতো তার ঠিক ৭ দিন আগে ইস্ট পাকিস্তানে প্রকাশ হতো। অনেক ফর্মালিটি করতে হতো। সময় কম পাওয়া যেত। তখন বাইরে যাওয়াটা মিরাকল-ই বলা যায়। মুর্তজা বশীর, কিবরিয়া সাহেব গেছেন। তারা সরাসরি গেছেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে যাওয়াটা বিরাট বিষয়।


প্রশ্ন: বাংলাদেশে এচিংয়ের এই ধারা প্রবর্তনের কোনও সুযোগ পেয়েছিলেন কী? নাকি অন্য কোনও ফরমেশনে বাংলাদেশকে সম্পূর্ণ নতুন কিছু দিতে চান?


মনিরুল ইসলাম: বর্তমানে যে অবস্থা, তখন সব কিছু অতটা সহজলভ্য ছিল না। এখন যে স্কোপটা দেখার, বোঝার; আমাদের সময়ে তা ছিল না। আমরা কখনও অরিজিনাল পেইন্টিং দেখিনি। কোনও গ্যালারি ছিল না। প্রথম মুর্তজা বশীর, আমিনুল ইসলাম এক্সিবিশন করলেন। মডার্ন আর্ট  তারা নিয়ে আসলেন। এই প্রথম দেখলাম। সিনেমার ব্যানার দেখতাম। এগুলো আমার ইস্পিপিরিশন। আর্টপিস। দিল্লি মিউজিয়ামে মধুবালার (নায়িকা) একটা পোস্টার দেখলাম। সব ছবি যেন ম্লান। অরিজিনাল লিথোগ্রাফি বলতে যা বোঝায়। ঐ সময়ে বই ছিল না। আর্ট ফাউন্ডেশন কিছু বই দিয়ে গেল, ঐটাই ছিল শেখার জায়গা। প্রথম দেখলাম লিথোগ্রাফি। ঐ টাইমে জানার ইচ্ছে ছিল প্রবল। মুস্তাফা মনোয়ার এখনও যে ড্রয়িং করে​ন​ না! টিচার হিসেবেও তিনি অসাধারণ। ভারত থেকে এলেন ওয়াটার কালারের গোল্ড মেডেলিস্ট। আমি তাদের কাছে অনেক শিখেছি। সাদা কাগজে সাত দিনে ধরে দাগ দেওয়াতেন। একটা কাগজে আর কত বেশি দাগ দেওয়া যায়? আর ওয়েল পেইন্টিং যত কাজ করবে তত ভালো হবে। মেথড অনেক চেঞ্জ হয়েছে। এখন বুঝি সাদা কাগজে দাগ টানাটা কতটা উপকার হয়েছে। একটা স্কুলিং খুব জরুরি। এটা ফাউন্ডেশন। আমরা তো ড্রয়িং করছি হয়তো কোনও কাজে আসেনি। স্কুলিং খুব জরুরি। সেখানে ডিসিপ্লিন আছে। যা আয়ত্ত করার জন্য খুব কাজের। এগুলো বেজ। এটা হয়তো কোনও কাজে আসে না। লাইন বিষয়টি আছে। ভেনিসিং লাইন​,​ বোক্রেন লাইন। এগুলো​র​ মিনিং আছে। এগুলো জানা জরুরি।


প্রশ্ন: একটা সময় ছাত্র ছিলাম, পাতা এঁকেছি, ল্যান্ডস্কেপ করছি, আউটডোর করছি, হচ্ছে না তাও কষ্ট করে গেছি। এখন তো অনেকে ফটোগ্রাফি করে ফার্স্টক্লাস পাচ্ছেন। তাহলে আমরা কি স্যার ভুল করেছি?


মনিরুল ইসলাম: না​,​ ভুল করিনি। এখন একটা যুগ এসেছে​ এমনই​। কিন্তু কিছু জিনিস সার্বজনীন। ক্যামেরায় কখনও আসল কালার ধরা যায় না। পাতা তো সবসময় চেঞ্চ হয়ে যায়। দূরে গেলেই তা হয়। এই যে ধুলার মধ্যে, রোদের মধ্যে কাজ করা- এগুলো খুব শক্তিশালী। নেচারে যাওয়ার মাধ্যম। ধুলা, বৃষ্টি, কুয়াশা অস্পষ্ট। বিপরীত লাইটে রোদও অস্পষ্ট।​ ​মাটি, বাতাস, আগুন ও পানি- এগুলোতে আমরা বেঁচে আছি। এগুলো খুবই দরকারি। কিন্তু মাথায় রাখতে হবে, রোদ যখন বদলায় তখন ধ্বংস করে দেয় সব। আমি বলব, যুগের সাথে সাথে সবাই বলবে, আমরা ভালো ছিলাম। তবে সার্বজনীন বিষয় থাকবে। ঘুরে ঘুরে সেই জায়গায় আসতে হবে। এখন একটা ক্রাইসিস চলছে। এটা বলা যায়, ৫-৭ বছরের গ্যাপ। আর্টের এখন ব্যক্তিত্ব নাই। এখন আর্ট আর নন আর্ট বোঝা মুশকিল। কোটি আর্টিস্টের নিয়ত একটাই- তারা বিখ্যাত হবে​ন​। 


প্রশ্ন: কবিতা, গান, চিত্রকলার সব শাখায় এটা প্রযোজ্য?


মনিরুল ইসলাম: আসলে সৃষ্টিশীলতার একই উৎস। কবিতা, গান, চিত্রকলা- সবই একই। একটা সিনেমার দুটি মেইন নায়ক থাকতে পারে না। একটা মেইন, বাকিগুলো সাপোর্টিং। তেমনি পেইন্টিংটাও তাই। একটা ছবিতে অনেকগুলো ইন্টারেস্টিং বিষয় থাকে না। অনেক সময় পেইন্টিংয়ে দেখা যায়, দশটা ছবি। ইন্টারেস্টিং মনে হতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে কিছু হয় না। একটা বিষয়, ঢাকায় আর্টের ক্রিটিসিজম বলে কিছু নাই। রিয়েল ক্রিটিসিজম করলে খবর আছে।

Comment As:

Comment (0)