সাহিত্য হলো মানবচিন্তার বহুবর্ণিল প্রকাশ: সৌমিত্র

A+ A- No icon

প্রশ্ন: ভাষা আন্দোলন বাঙালি সংস্কৃতির দিকে নজর ফেরাল। আপনি কি মনে করেন, এই ঐতিহাসিক ঘটনার পর বাংলা সাহিত্যে সংস্কৃতিতে একটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে? এসে থাকলে সেটা কী? না এসে থাকলে কেন আসেনি?


সৌমিত্র শেখর: আপনি যাকে ‘ভাষা আন্দোলন’ বলছেন তা আসলে ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’। ভাষার লড়াই বা আন্দোলন ছোট-বড় করে আগেও ছিল, এখনো আছে। কিন্তু ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনটি বাংলাকে ‘রাষ্ট্রভাষা’ করার দাবিতে ছিল। আর এখান থেকেই পাকিস্তান আমলে বাঙালির স্বতন্ত্র অভিযাত্রা আরম্ভ হয়। ১৯৪৭-পরবর্তীকালে যে ধারার সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চা দেখা গেছে, মাত্র চার বছরের একটু বেশি সময়ের মধ্যে তা থেকে এ দেশের বাঙালিরা লক্ষ্যভেদী তিরের মতো বেরিয়ে এসেছে। আর সেটা ঘটেছে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও শহীদদের কারণে। এটি খুবই ইতিবাচক পরিবর্তন। পাকিস্তানবাদী সাহিত্য–সংস্কৃতির ধারকদের অনেকেই রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের পর নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার মিছিলে শামিল হন। বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ভিত্তিটি তৈরি হয় এভাবে এবং ষাটের দশকে ঘটে যায় সাংস্কৃতিক নীরব বিপ্লব। আর এর ওপর ভিত্তি করেই হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ফলে বলা চলে, ১৯৫২-তে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বিলম্বিত হলে বা না হলে পাকিস্তানবাদী সাহিত্য–সংস্কৃতির ক্লীব ধারাটি আরও প্রলম্বিত হতো এবং তাতে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো বাঙালি জাতি।


বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকে ভিত্তিটি তৈরি হয় এভাবে এবং ষাটের দশকে ঘটে যায় সাংস্কৃতিক নীরব বিপ্লব। আর এর ওপর ভিত্তি করেই হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। ফলে বলা চলে, ১৯৫২-তে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বিলম্বিত হলে বা না হলে পাকিস্তানবাদী সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্লীব ধারাটি আরও প্রলম্বিত হতো এবং তাতে সার্বিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো বাঙালি জাতি।


প্রশ্ন: প্রমিত বাংলা বিষয়ে বেশ কিছু বিতর্ক আছে। পূর্ব বাংলার যে ভাষায় কথা বলা হয়, প্রমিত বাংলার সঙ্গে তার কি কোনো বিরোধ আছে? থাকলে কীভাবে এই বিতকের্র নিরসন করা যায়?


সৌমিত্র শেখর: আমরা যেন রাজনৈতিক মানচিত্রের সঙ্গে ভাষার মানচিত্রকে মিলিয়ে না ফেলি। এমনটি অনেকেই করে থাকেন। রংপুরের ভাষা আর চট্টগ্রামের ভাষাই কি এক কিংবা সিলেটের ভাষার সঙ্গে কি বরিশালের ভাষা মেলে? সর্বাংশে মিলবে না, এটাই স্বাভাবিক। আপনি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারের বাংলার সঙ্গে মুর্শিদাবাদের বাংলার অনেক পার্থক্য পাবেন। এগুলো বৈচিত্র্য। কিন্তু ভাষার আন্তরশৃঙ্খলা তো এক! তাই বরিশাল আর কোচবিহার যত দূরেই হোক, দুই জায়গার মানুষের মুখের ভাষাকেই বাংলা বলতে হবে। বাংলা তো শুধু এখানেই নেই। আছে ত্রিপুরা আর আসামেও। আসামের কাছাড় জেলার বাংলার সঙ্গে তিনসুকিয়ার ভাষার আবার দুস্তর ফারাক। কিন্তু ওই যে বললাম, ভাষার আন্তরশৃঙ্খলা—তাতে কোনো বড় পার্থক্য নেই। এ অবস্থায় পশ্চিমবঙ্গের বাংলার সঙ্গে বাংলাদেশের বাংলার আপাতত পার্থক্য, অন্তত উচ্চারণ বা সামান্য কিছু শব্দ-প্রয়োগে—হতেই পারে। না হলেই বরং আশ্চর্যের ছিল। বাংলা ভাষার এই ছোট ছোট পার্থক্যগুলো মূলত উপভাষার বৈশিষ্ট্যজ্ঞাপক। এর মধ্যে নদীয়া-শা‌ন্তিপুরের ভাষারূপকে প্রমিত বলে গ্রহণ করা হয়েছে। আর এই নদীয়ারই অংশ ছিল আমাদের কুষ্টিয়া-চুয়াডাঙ্গা-মেহেরপুর। অর্থাৎ গৃহীত প্রমিত ভাষাও আসলে উপভাষা। সব কিছুরই একটি ‘মান’ রূপ থাকে। ভাষার ক্ষেত্রেও তেমনি প্রমিত রূপটি হচ্ছে আসলে বাংলা ভাষার ‘মান’ রূপ। এ নিয়ে বিতর্ক যাঁরা তোলেন তাঁরা উদ্দেশ্যবাদী। বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গের মানুষ শুধু নন, পৃথিবীর সব প্রা‌ন্তের বাঙালিরা যে যাঁর উপভাষায় কথা বলুন। কিন্তু ‘মান’ হচ্ছে প্রমিত বাংলা ভাষা— এটি সব পক্ষের গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়।


প্রশ্ন: এখন বই, পত্রপত্রিকায় লেখা ছাপা না হলেও লেখকেরা নিজেদের প্রকাশের জন্য ফেসবুক বা অন্যান্য প্রযুক্তিনির্ভর মাধ্যম বেছে নিচ্ছেন। সেগুলো পড়াও হচ্ছে। আপনি কি মনে করেন, সাহিত্যও একসময় এই মাধ্যমগুলোতেই টিকে থাকবে? বই বা ছাপা পত্রিকার জায়গা কি এই নতুন মাধ্যমগুলো নিয়ে নেবে?


সৌমিত্র শেখর: আমি মনে করি না কাগজের ছাপা বন্ধ হয়ে যাবে। তবে সংখ্যায় নয়, হারে কমে যাবে। এখন কি তালপাতায় লেখা হয় কিংবা ভূর্জপত্রে? একসময় কিন্তু সেটাই হতো। এই দেখুন না, আপনাদের পত্রিকা অফিসেই রিপোর্টারদের ডেস্কে কোনো কাগজ নেই। আপনি আমার কথাগুলো কাগজহীন মাধ্যমে প্রকাশ করছেন। এটি যদি পাঠকের কাছে পৌঁছায়, তবে মুখলেখ বা ফেসবুকের লেখাও পৌঁছাবে। আমি মনে করি, এর মাত্রিকতা আরও বাড়বে। আর সাহিত্য বলতেই পুঁথি বা কাগজে লেখা কিছু, সে ধারণার প্রকোষ্ঠও ভাঙবে। তবে সাহিত্য থাকবেই। কারণ, সাহিত্য হলো মানবচিন্তার বহুবর্ণিল প্রকাশ। এ প্রকাশটি না ঘটলে মানুষ রক্তমাংসের মূর্তিতে পরিণত হবে। তাই প্রকাশ-মাধ্যম বদল নিয়ে ভাবার তেমন প্রয়োজন নেই। ভাবতে হবে, যা প্রকাশ করছি তা আদৌ ‘সাহিত্য’ হচ্ছে কি না তাই নিয়ে।


প্রশ্ন: ইতিহাসভিত্তিক লেখায় অনেক সময়ই রেফারেন্স উল্লেখ করা হয় না। কিংবা বিতর্কিত রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়। আপনি কি মনে করেন, যেকোনো লেখাই তথ্যসমৃদ্ধ হতে হলে গবেষণার দরকার আছে? বলতে চাইছি, ভুল তথ্যের ওপর নির্ভর করে লেখালেখি কি সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিপদ ডেকে আনতে পারে?


সৌমিত্র শেখর: যেকোনো বিতর্কিত বিষয়ই পরিত্যাজ্য। বিতর্কিত রেফারেন্স হলে তো অবশ্যই পরিত্যাগ করতে হবে। কিন্তু আমি বলতে চাই ইতিহাস নিয়ে দুই ধরনের লেখা হতে পারে। একটি ইতিহাসের যথাযথ ব্যবহার করে, অন্যটি ইতিহাসকে আশ্রয় করে। যেখানে ইতিহাসের যথাযথ ব্যবহার করে লেখা হবে, সেখানে লেখককে প্রশ্নাতীতভাবে ইতিহাসনির্ভর হতেই হবে। কল্পনা করার কোনো সুযোগ নেই। আর যেখানে ইতিহাসের আশ্রয় থাকবে, সেখানে তাঁর কল্পরাজ্যে বিচরণের সুযোগ থাকবেই। কিন্তু সে কল্পনা হবে বহিরঙ্গীয়, অন্তরঙ্গীয় বা তথ্যের নয়। ঐতিহাসিক তথ্যকে বিকৃত করে যা–ই রচিত হোক না কেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু যদি ফিকশন কেউ রচনা করতে চান, তাহলে তাঁর সামনে থাকবে স্বাধীনতার অমিত আকাশ!


প্রশ্ন: বাংলাদেশ আর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্য ও ভাষার মধ্যে মূল পার্থক্যগুলো কী কী?


সৌমিত্র শেখর: বাংলা সাহিত্যকে সামনে রেখে উত্তরটি দিলে বলতে হবে, প্রত্যেক দেশেরই নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আর রাষ্ট্রীয় চেতনা থাকে, তাতে তারা পৃথক। কিন্তু ভাষা ও সংস্কৃতিতে ছোট কিছু অমিল সত্ত্বেও অভিন্ন। বহির্বিশ্বের বাংলা সাহিত্য ও ভাষার ক্ষেত্রেও এই একই কথা বলা চলে। এই মিল-অমিল নিয়েই বিশ্বময় আছে বাঙালিরা, বাংলা ভাষাও।


প্রশ্ন: একুশের বইমেলায় কয়েক হাজার বই বের হয়। এর মধ্যে মানসম্পন্ন বইয়ের পাশাপাশি অনেক মানহীন বইও দেখতে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে কি প্রকাশকদের জন্য কোনো দিকনির্দেশনা বা রীতি থাকা উচিত? ভুল বানান, ভুল বাক্য বিষয়ে কি প্রকাশনালয়ে একটি টিম থাকা দরকার, যারা সম্পাদনা করবে ঠিকভাবে?


সৌমিত্র শেখর: অবশ্যই। প্রকাশকদের জন্য নীতিমালা থাকা দরকার। যেমন: লেখকদের সঙ্গে চুক্তি আছে কি না; লেখকদের পাওনা মেটানো হয়েছে কি না; প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে ‘সম্পাদক’ হিসেবে কেউ বা কোনো দল কর্মরত আছেন কি না ইত্যাদি। প্রথমেই সব প্রতিষ্ঠানকে এর আওতায় আনা কঠিন হবে। তাই ‘এ’ গ্রেড / ‘বি’ গ্রেড ইত্যাদি চিহ্নিত করা যেতে পারে। নির্ধারিত মানদণ্ডগুলোর নিরিখে এই গ্রেড থাকবে। পাঠক বুঝে যাবেন তিনি ‘এ’ গ্রেডের নাকি ‘বি’ গ্রেডের প্রতিষ্ঠান থেকে বই কিনছেন। এমন হলে সবাই মানদণ্ড অনুসারে তৈরি হবে। কারণ, কেউ ‘বি’ গ্রেডে থাকতে চায় না।


প্রশ্ন: বেশির ভাগ প্রকাশনীই একুশের বইমেলা লক্ষ করে বই ছাপে। এই প্রবণতার ভালো–খারাপ দিকগুলো নিয়ে বলুন।


সৌমিত্র শেখর: এটি ভালো দিক নয়। শুধু একুশে গ্রন্থমেলাকেন্দ্রিক বই প্রকাশ তিন দিক থেকেÿক্ষতিকর। প্রথমত, এতে পাঠকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারণ সারা বছর ভালো নতুন বই পেলে তাঁর আগ্রহ যেমন এক বই থেকে অন্য বইয়ে সঞ্চারিত হতো, সেটি হতে পারে না। দ্বিতীয়ত, এতে ভালো লেখক হওয়ার ক্ষেত্র সংকুচিত হয়। বিশেষ করে, নতুন লেখকদের পুরোনো লেখক ও বহুগ্রন্থের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। সারা বছর বই বের হলে একটি ভালো বই লিখেই সহজে সবার দৃষ্টিতে আসতে পারেন কোনো নতুন লেখক। তৃতীয়ত, বইয়ের প্রকাশনা ও বাঁধাই ইত্যাদির ক্ষেত্রে মান উন্নত রাখা প্রকাশকের পক্ষেÿসম্ভবপর নাও হতে পারে। কারণ, অনেক প্রকাশককে শতাধিক নতুন বই প্রকাশ করতে হয়। তবে, বইমেলায় কোনো কোনো বই অতি-প্রচারের কারণে সহজে চোখেও পড়ে অনেক মানুষের, অন্য সময় যেটি সম্ভবপর নাও হতে পারে।

Comment As:

Comment (0)