বড় একটা মন্দায় পড়ে যাবে বিশ্ব অর্থনীতি: ড. জাহিদ হোসেন

A+ A- No icon

প্রশ্ন: বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা এখন কেমন দেখছেন?


জাহিদ হোসেন: অর্থনৈতিক অবস্থা যাচাইয়ের জন্য যে সূচককে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বা চূড়ান্ত হিসেবে ধরা হয়, সেটা হলো উৎপাদন ও ব্যয়ের অবস্থা। মানে প্রবৃদ্ধির অবস্থাটা কী। কিন্তু আমরা বছর চলাকালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি সম্পর্কে সরাসরি কোনো তথ্য পাই না; যেমন অন্য অনেক দেশে পাওয়া যায়। যেমন ভারতে, শ্রীলঙ্কায় প্রতি প্রান্তিকের হিসাব পাওয়া যায়। আমাদের দেশে সেই ব্যবস্থা নেই; কাজেই আমাদের নির্ভর করতে হয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত সূচকগুলোর ওপর সেগুলোর প্রবণতার ওপর। তা-ও খুব বেশি সংখ্যক সূচক যে আছে, তা নয়।


প্রশ্ন: চলতি অর্থবছরে সেই সূচকগুলো কেমন?


জাহিদ হোসেন: বাণিজ্য দিয়ে যদি শুরু করি, এখানে রপ্তানি একটা বড় খাত। সেখানে বছরের শুরু থেকেই একটা নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় রপ্তানি কমেছে। তারপর আপনি যদি বিনিয়োগ দেখেন, সেখানেও প্রবণতা নেতিবাচক। যেসব সরাসরি তথ্যের ভিত্তিতে পরিসংখ্যান ব্যুরো বিনিয়োগের হিসাব করে, সেগুলো হচ্ছে যন্ত্রপাতির অভ্যন্তরীণ উৎপাদন এবং বিদেশ থেকে আমদানি। অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খুব বেশি নয়, আমাদের বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই আসে দেশের বাইরে থেকে। এসব যন্ত্রপাতি অর্থাৎ ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানিও আগের অর্থবছরের তুলনায় নেতিবাচক। অর্থাৎ বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও একটা দুর্বল পরিস্থিতির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তৃতীয়ত হলো ব্যক্তি খাতের ভোক্তা ব্যয়, এটা আমাদের জিডিপির সবচেয়ে বড় অংশ, প্রায় ৬৫ শতাংশ। এটা সম্পর্কে সরাসরি কোনো তথ্য নেই; তবে ভোক্তা পণ্য বিক্রি করে এমন বড় কোম্পানি, যারা শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত, তাদের বিক্রি সম্পর্কিত যেসব স্টেটমেন্ট সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে; সেখানেও দেখা যাচ্ছে যে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় তাদের বিক্রি কমে গেছে। এর সঙ্গে যদি ঢাকা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা ধরা হয়, সেখানে দোকানের সংখ্যা, ক্রেতার সংখ্যা, বিক্রির পরিমাণ ইত্যাদি নিয়ে মেলার শেষে যে তথ্যগুলো বেরিয়েছে, সেখানেও দেখা যাচ্ছে যে আগের বছরের তুলনায় ক্রেতার সংখ্যাও কম ছিল, বিক্রির পরিমাণও কমে গেছে। ভোক্তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে দুর্বলতার এটাও একটা লক্ষণ।


প্রশ্ন: সব খাতে সূচক এভাবে কমার প্রবণতার কারণ কী?


জাহিদ হোসেন: ভোক্তা ব্যয় বাড়ারও কিছু উপাদান আমরা লক্ষ করেছি। যেমন প্রবাসী আয়। ইদানীংকালে, অর্থাৎ ২০১৯ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রবাসী আয়ের প্রবৃদ্ধি বেশ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেড়েছে। তারপর একটু কমলেও এখনো ২০ শতাংশের ওপরে আছে।


প্রশ্ন: এই পরিস্থিতিতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে একটা বৈশ্বিক মহামারির আকারে। আমাদের অর্থনীতিতে প্রভাবগুলো কেমন হতে পারে?


জাহিদ হোসেন: এটা যখন চীনে শুরু হলো, তখন ভাবা হয়েছিল যে আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় (সাপ্লাই চেইন) একটা বিঘ্ন ঘটবে। এর ফলে আমাদের অভ্যন্তরীণ চাহিদার জন্য উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে, রপ্তানি পণ্য সরবরাহ করা সম্ভব হবে না। কারণ, অনেক উপাদান আমাদের চীন থেকে আমদানি করতে হয়। এ রকম সাময়িক বিঘ্ন আশঙ্কা করা হয়েছিল। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে চীনে করোনাভাইরাসের প্রকোপ কমে যাচ্ছে, সেখানে কিছু কারখানা খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে চীন থেকে সরবরাহ চেইনে বিঘ্নটা হয়তো খুব দীর্ঘায়িত হবে না। কিন্তু এখন তো তার চেয়েও বড় সমস্যা দেখা যাচ্ছে যে এটা ইউরোপে এবং আমেরিকায়ও ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দুটো বড় বাজার ইউরোপ এবং আমেরিকা। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউরোপের সঙ্গে আমেরিকার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছেন। আমার মনে হচ্ছে বিশ্ব অর্থনীতি একটা মন্দায় পড়ে যাবে। যদিও কিছু পলিসি রেসপন্স করা হয়েছে; ব্যাংক অব ইংল্যান্ড সুদের হার কমিয়েছে; আমেরিকার ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকও সুদের হার কিছুটা কমিয়েছে। অন্যান্য দেশে কিছু আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু যেখানে মানুষ আতঙ্কিত, সেখানে আপনি সস্তায় ঋণ দিয়ে লোকজনকে তো দোকানে পাঠাতে পারবেন না। বা তারা রেস্টুরেন্টে খেতে যাবে না বা প্লেনে উঠবে না। এতে ব্যবসায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাদের সহায়তা হবে। কিন্তু আতঙ্কের কারণে চাহিদার যে পতন ঘটেছে, সেটা না কাটলে তো অর্থনৈতিক মন্দা এড়ানো যাবে না। তা করোনাভাইরাসের কারণে যেসব ক্ষতিকর পদক্ষেপ (প্যানিক রেসপন্স) নেওয়া হচ্ছে, সেগুলোও বিশ্বের অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে।


প্রশ্ন: তাহলে এখন কী করণীয় বৈশ্বিক এবং আমাদের দেশীয় পরিসরে?


জাহিদ হোসেন: এখন সব দেশেরই সবচেয়ে বড় করণীয় এমন পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে না পড়ে। ইতিমধ্যে যেসব ঝুঁকি দৃশ্যমান হয়েছে, সেগুলো সর্বোচ্চ দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এখন আমাদের নীতিনির্ধারকদের এটাই এক নম্বর অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। করোনাভাইরাস যেন আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সে জন্য ডাক্তার, নার্স, ওষুধপথ্য, যন্ত্রপাতি, হাসপাতালের সরঞ্জাম, বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানিং মেশিন ইত্যাদি যা যা প্রয়োজন, সব প্রস্তুত রাখতে হবে। সচল রাখতে হবে। এ রকম জরুরি ও নাজুক পরিস্থিতিতে থার্মাল স্ক্যানিং যন্ত্র বিকল হয়ে যায়—এটা কীভাবে সম্ভব? করোনাভাইরাসের কারণে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি মোকাবিলা ও সুরক্ষাসংক্রান্ত ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এই ক্ষেত্রে অদক্ষতা, দায়িত্বে অবহেলা, দুর্নীতি এসবের প্রতি জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। দায়িত্বশীলদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আর অর্থনৈতিক দিকে, আমরা অতীতে দেখেছি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রাজনৈতিক অস্থিরতা ইত্যাদি কারণে অর্থনীতির ক্ষতি হয়, ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। তখন ক্ষতিগ্রস্তদের নীতি-সহায়তার প্রয়োজন হয়; কিন্তু সেটার সঙ্গে সুযোগসন্ধানীরাও যুক্ত হয়ে যায়, যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। কাজেই করোনাভাইরাসের নেতিবাচক প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে যাঁরা (ভালনারেবল), তাদের চিহ্নিত করে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের মাধ্যমে সুরক্ষা দিতে হবে।

Comment As:

Comment (0)