আইনি প্রক্রিয়ায় খোঁজা হচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তির পথ

A+ A- No icon

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কারাবাসের দুই বছর। এ উপলক্ষে তার মুক্তির দাবিতে রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে দুপুর ২টায় সমাবেশ করবে বিএনপি। সমাবেশ থেকে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বার্তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলটির নীতিনির্ধারক নেতারা। ইতোমধ্যে বিএনপির জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত রেখে মুক্তির আইনগত দিক পর্যালোচনা করে 'নতুন প্রস্তাব' তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে।

 

এতে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১) ধারা অনুযায়ী খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত বা মওকুফের মাধ্যমে জামিন বা মুক্তির আবেদন করার কথা বলা হয়েছে। এ প্রস্তাব বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অনুমোদন পেলে শিগগিরই খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হতে পারে। এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, 'ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১) ধারা অনুযায়ী সরকার দণ্ডিতের সাজা কমিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এমন কোনো আবেদন সরকারের কাছে না আসা পর্যন্ত তা নিয়ে আলোচনার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না, সিদ্ধান্ত তো পরের বিষয়।'

 

এদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দলের নয়াপল্টনের সমাবেশ থেকে খালেদা জিয়ার দ্রুত মুক্তির বিষয়ে 'বড় ধরনের বার্তা' দেবে বিএনপি। এ আন্দোলনের ধারা নতুন যে রূপ নেবে, তাতে সবাইকে সাহসী ভূমিকা পালন করতে হবে। এদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুটি মামলায় ১৭ বছরের সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের এই দিনে কারাগারে যান।

 

তিনি বর্তমানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে কারা কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তার মুক্তির বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, 'ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১) ধারা অনুযায়ী কোনো সাজার কার্যকারিতা শর্তহীনভাবে স্থগিত করার একমাত্র ক্ষমতা সরকারের হাতে। আশা করছি, সরকার তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মুক্তির পথ সুগম করবে। যাতে তিনি চিকিৎসার সুযোগ পান।'

 

খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, 'বিএনপি চেয়ারপারসন ইতোমধ্যে দুই বছর সাজা খেটেছেন। সর্বোচ্চ আদালতেও তার জামিন হয়নি। তিনি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তা ছাড়া আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছাড়াও তিনি একজন বয়স্ক অসুস্থ মহিলা- এ কারণেও প্রচলিত আইন অনুযায়ী তিনি মুক্তি পেতে পারেন। অন্তত চিকিৎসার জন্য হলেও তার জামিন পাওয়ার অধিকার রয়েছে।'

 

এক্ষেত্রে সরকারের কাছে আবেদন করা হবে কিনা- এমন প্রশ্নে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, 'জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের পক্ষ থেকে বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের জানানো হয়েছে। তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে সরকার নিজ উদ্যোগেও খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুসারে তাকে মুক্তি দিতে পারে।' ফৌজদারি কার্যবিধার ৪০১ (১) ধারায় বলা হয়েছে,

 

'কোনো ব্যক্তি অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইলে সরকার যে কোনো সময় বিনা শর্তে বা দণ্ডিত ব্যক্তি যা মানিয়া লয়, সেইরূপ শর্তে যে দণ্ডে সে দণ্ডিত হইয়াছে, সেই দণ্ডের কার্যকরীকরণ স্থগিত রাখিতে বা সম্পূর্ণ দণ্ড বা দণ্ডের অংশবিশেষ মওকুফ করিতে পারিবে।' এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, 'সরকার চাইলে ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ ধারা অনুযায়ী দণ্ডিত খালেদা জিয়ার সাজা কমিয়ে দিতে পারে। আইনে এমন বিধান রয়েছে।'

 

ভিন্নমত দুদকের আইনজীবীর: অবশ্য অ্যাটর্নি জেনারেলের এ বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেছেন দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোহাম্মদ খুরশীদ আলম খান। দুদকের মামলায় সরকার খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত বা মওকুফের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারে না দাবি করে তিনি বলেন, 'ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১) ধারা দুদক আইনে করা মামলার জন্য প্রযোজ্য নয়। ৪০১ (১) ধারা শুধু সরকারের মামলার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।

 

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দুটি দুদকের মামলা, তাই সরকারের এখানে কিছু করার নেই। কারণ দুদকের মামলা দুদক নিজেই অনুমোদন করে, সরকার নয়। মামলার এফআইআর, চার্জশিটও দুদক করে, এমনকি মামলার পরিচালনাও দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিটের মাধ্যমে হয়। তাই ফৌজদারি ৪০১ (১) ধারা অনুসারে খালেদার দণ্ড স্থগিত বা মওকুফের বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের বক্তব্য অগ্রহণযোগ্য। তাছাড়া খালেদা জিয়ার সাজার বিরুদ্ধে করা আপিলও এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।'

 

এ অবস্থায় সরকারের কাছে খালেদা জিয়ার সাজা স্থগিত বা মওকুফের বিষয়ে কোনো আবেদনের সুযোগ নেই- এমন মন্তব্য করে খুরশীদ আলম খান বলেন, 'দুদক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়। এটি আইন দ্বারা বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হতে পারে, কিন্তু দুদক নয়। এ বিষয়ে বিজ্ঞ অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করছি। দুদক যদি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই হতো, তাহলে দুদক সংসদীয় কমিটির ডাকে সাড়া দিত। এর আগে বিভিন্ন সময় দুদককে সংসদীয় কমিটি তলব করেছে। 

 

বিষয়টি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের নজরে নেওয়া হলে তিনি বলেন, 'দুদক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সরকারের বাইরে নয়। যে কোনো আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ৪০১ (১) ধারা অনুসারে সরকারের কাছে দণ্ড স্থগিত বা মওকুফের বিষয়ে আবেদন করতে পারে। খালেদা জিয়া যদি এমন আবেদন করেন তাহলে সরকার চাইলে তার ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিতে পারে। সরকার আবেদনের যৌক্তিকতা বিবেচনায় নিয়ে খালেদা জিয়া যতটুকু সাজা ভোগ করেছেন তার ভিত্তিতেই অবশিষ্ট সাজা স্থগিত বা মওকুফ করতে পারে।'

 

সমাবেশ ঘিরে প্রস্তুতি:  বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী সারাদেশে জেলা সদরে বিক্ষোভ সমাবেশ করবেন নেতাকর্মীরা। গতকাল শুক্রবার খালেদা জিয়ার রোগমুক্তি ও সুস্বাস্থ্য কামনায় দেশব্যাপী বাদ জুমা বিভিন্ন মসজিদে দোয়া মাহফিল কর্মসূচি পালন করে এ দল। ব্যাপক লোক সমাগমের মাধ্যমে সমাবেশকে সফল করার প্রস্তুতিও সম্পন্ন করেছেন দলটির শীর্ষ নেতারা। বিএনপির সমাবেশের অনুমতির জন্য প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীর নেতৃত্বে বিএনপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল ডিএমপি কমিশনারের সঙ্গে দেখা করে এবং লিখিতভাবে অনুমতি চায়।

 

এ্যানী জানিয়েছেন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) থেকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। একদিন আগে পুলিশ প্রশাসনের অনুমতি পাওয়ায় সমাবেশ নিয়ে কোনো শঙ্কা কাজ করছে না বলে জানিয়েছেন নেতাকর্মীরা। এ প্রসঙ্গে পল্টন থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক বলেন, সমাবেশের অনুমতি চেয়ে বিএনপি যে আবেদন করেছে, সে ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এখনও 'হ্যাঁ' বা 'না' কিছু জানায়নি। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, সমাবেশের জন্য বিএনপিকে অনুমতি দেওয়া হতে পারে।

 

নেতারা জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চাঙ্গাভাবকে কাজে লাগিয়ে সমাবেশকে সফল করা হবে। এ জন্য দফায় দফায় যৌথসভা করেছেন তারা। বিএনপির দুই মেয়র প্রার্থী ও দল সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থীদের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেছেন তারা। এসব বৈঠকে নেতাকর্মীদের সমাবেশ সফল করতে সর্বাত্মক ভূমিকা রাখতে বলা হয়েছে। ঢাকাসহ এর আশপাশের জেলা থেকেও নেতাকর্মীরা সমাবেশে আসবেন বলে জানা গেছে।

 

Comment As:

Comment (0)