কেরলের অচেনা অভয়ারণ্য মরমিয়া শেনদুরনি

A+ A- No icon

ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি...শন্শন্ হাওয়া...জঙ্গলের নিস্তব্ধতাকে লজ্জা দিয়ে কাঠঠোকরাটার গাছকোটর তৈরির শব্দ...সম্বরের ডাক...ভেজা মাটি আর পাতার স্তূপের ফাঁকে সরে সরে যাওয়া শতপদী সানবার্ডের দুষ্টুমি...বয়স্ক গাছেদের আদুল গায়ে আড়াল নিয়ে দলবাঁধা ছত্রাকেরা...জঙ্গলের গা ভিজিয়ে দেওয়া ঝোরার শব্দ...সব মিলিয়ে শেনদুরনি স্যাংচুয়ারির প্রেমে পড়ে গেলাম। মনের ভিতর দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামা শরীর জোড়া সে প্রেম। এ’প্রেমে নেই কোনও শরীরী বিভঙ্গ, শুধুমাত্র মন ভেঙেচুরে একাকার।


বনবাংলোর জানলা দিয়ে লেকটাকে দেখা যায়। এক একটা সময়ে এক এক রূপ। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই তাকে বুকের মাঝে নিয়ে তার মাঝেই ভেসে যেতে ইচ্ছা করে। হাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে তার জলের ভেঙে যাওয়া, আবার গড়ে ওঠা, যেন কোনও এক সুন্দরী যুবতী অনাবৃত করছে নিজেকে বা আবৃত, যেমনটি করে থাকে ভরা শ্রাবণের মেঘ জঙ্গলের মাথার উপর। তার ছলাৎ-ছল যেন বহু দিন না শোনা কোনও এক ঠুমরির সুরের মূর্ছনা...যা মুহূর্তে সেঁধিয়ে যায় মনের মাঝে...। অনন্য শেনদুরনি।


পশ্চিমঘাটের অগস্ত্যমালা ও অসাম্বু পর্বতমালার পশ্চিমে, কেরলের কোল্লাম জেলায় ১৭২ বর্গ কিলোমিটারের এই অরণ্য ১৯৮৪ সালে অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিতি পায়। এখানে এ বার আমি বনবিভাগের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও তাঁর সুন্দরী, বিদুষী স্ত্রীর অতিথি। তাঁরা এখানে উপস্থিত না থাকলেও আড়াল থেকে মেঘনাদের মতো সব কিছুর নিখুঁত ব্যবস্থা করে রেখেছেন। প্রতি পদক্ষেপে আমার মতো অতি সাধারণ এক মানুষ ‘ভিআইপি ট্রিটমেন্ট’ পাচ্ছি। পৌঁছনোর পর একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পরেছিলাম। সর্বক্ষণের সঙ্গী সুব্রহ্মণ্যম। প্রথম চক্করের ফাঁকে দেখে ফেললাম বেশ কিছু সম্বর আর চিতল হরিণ। শুরুর জন্য বেশ ভাল।


সন্ধ্যা যখন নামল...বনবাংলোর হাতায় আলো জ্বলছে। আকাশে চাঁদ। তার আলো ছলকাচ্ছে লেকের জলে। হাওয়ায় জল ভাঙার শব্দ। হঠাৎ...একদম হঠাৎই আকাশ ছাইল কালো মেঘে...চাঁদ উধাও। দূরে জঙ্গল থেকে কি এক শব্দ...এগিয়ে আসছে...যেন অজস্র ঘুঙুরের শব্দ...তান বিস্তার করছে...বৃষ্টি এল জঙ্গলের বুক ভেঙে। লেকের জলে বৃষ্টির ফোঁটা...যেন ঘুঙুরের প্রতিটি দানা ছড়িয়ে যাচ্ছে ছিঁড়ে ছিঁড়ে...। কয়েকটা মুহূর্ত...তার পর বিরাম..., কিন্তু সে পদধ্বনির রেশ রয়ে গেল। চাঁদ আবার আলো দিচ্ছে। সে আলোকে সঙ্গী করে লেকের জলে সাঁতার কাটা।সে যে কি অনুভূতি! ফিরে এসে সুব্রহ্মণ্যমের বানানো এক কাপ গরম লেবু চা... আহঃ!


সকালেও একপালা একপশলা বৃষ্টি হয়ে গেল। আমি আর সুব্রহ্মণ্যম জঙ্গল পথে হাঁটছি। ভোরের নরম আলো। কাল রাতে সুব্রহ্মণ্যম গল্প শুনিয়েছে, এ জঙ্গলে মালাবার পিট ভাইপার, কিং কোবরা আর সাংঘাতিক গ্রিন পিট ভাইপারের দেখা পাওয়া যায়। নজর রেখে চলছি। মাথার উপর গাছের ক্যানোপিতে বনেট মাঙ্কি আর লায়ন-টেইলড ম্যাকার মাতামাতি। শপ্শপ্ শব্দে দুটো পায়েড হর্নবিল উড়ে গেল। জঙ্গলের সবুজে ফিনফিনে পাখনা মেলে দুটো ব্লু-টাইগার প্রজাপতি ভেসে যাচ্ছে..., আমার মনও। টাইগার স্পাইডাররা জাল বুনছে...একধারে ভেঙে পড়ে আছেএকটা লালচন্দনের গাছ...লাল রঙা লেজের দু-চারটে গেকো তার গায়ে ছুটে বেড়াচ্ছে। সকালের জঙ্গলে কত কি-ই যে এমনতর ঘটে চলে, যা শুধু অনুভব করা যায়। দেখে বা না দেখেও। ঘণ্টা দু’য়েক এমন অনুভূতিকে নিজের করে নিতে নিতে বনবাংলোয় ফেরার পথে পা রাখি। এ বার তো জিপ সাফারির পালা। উঃ! ভাবতেই কেমন যেন শিহরণ...

Comment As:

Comment (0)