‘ঈশ্বরের আপন দেশ’ কেরল আপনাকে স্বাগত জানায়

A+ A- No icon

মালয়ালম ভাষায় ‘কেরল’ শব্দের অর্থ ‘নারকেলের দেশ’। ভারতের দক্ষিণ পশ্চিম প্রান্তে মালাবার উপকূল জুড়ে গড়ে ওঠা এই রাজ্যটি ভারতের পর্যটন মানচিত্রে অন্যতম প্রধান নাম। মায়াবী সৈকতের গায়ে আছড়ে পড়া আরব সাগরের ঢেউ, ভেষজে সমৃদ্ধ সহ্যাদ্রি পর্বত, ঢেউ খেলানো সবুজ চা-বাগান, উচ্ছ্বল ঝর্না, ব্যাকওয়াটারের ধারে গ্রামজীবনের ছবি, রাজকীয় হাউজবোট, সংরক্ষিত অরণ্যে পাখি ও বন্যপ্রাণীর বিচরণ, কফি ও মশলা বাগান, আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা ও স্পা— এ যেন সত্যিই ‘ভগবানের আপন দেশ’। দ্রাবিড়ীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাসে সমৃদ্ধ কেরল আজ দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে বিশেষ ভাবে আকর্ষণীয়। কেরলের রাস্তাঘাট খুবই উন্নত ও পরিচ্ছন্ন। মানুষজনের ভদ্র ও বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার সবসময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে রেখেছে। কেরল ভ্রমণ কোচি থেকে শুরু করে তিরুঅনন্তপুরমে শেষ করা যায়। অথবা উল্টো ভাবেও সফরসূচি তৈরি করা যেতে পারে।

 

ভেম্বানাদ হ্রদের তীরে পাশাপাশি দুই যমজ শহর। একটি বন্দরনগরী কোচি (পূর্বনাম নাম কোচিন) আর অন্যটি রাজ্যের প্রধান বাণিজ্যনগরী এর্নাকুলাম। সবুজে ঘেরা এর্নাকুলাম ‘আরবসাগরের রানি’র শিরোপাটিও অর্জন করেছে। ইতিহাস ও প্রকৃতিকে একসঙ্গে উপভোগ করতে কমপক্ষে দুটো দিন এখানে থাকতেই হবে।


প্রথম দিনটা শহর ও তার আশপাশ দর্শনে বেরিয়ে পড়ুন। বড় বড় ইমারত, দোকানবাজার, অফিস-কাছারিতে জমজমাট শহরটা সদাই কর্মব্যস্ত। জাহাজ তৈরির কারখানাকে পাশ কাটিয়ে প্রথমেই চলুন ফোকলোর মিউজিয়াম। কেরলের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মিশেলে তৈরি নানান হস্তশিল্পের সম্ভারে সাজানো এই সংগ্রহশালাটি দেখলে তাক লেগে যাবে। কাঠের আসবাব, ঘর সাজানোর টুকিটাকি, ট্র্যাডিশনাল পোশাক ও অলঙ্কার, বাদ্যযন্ত্র— সব মিলিয়ে গোটা রাজ্যটাই যেন এক ছাদের তলায় এসে হাজির হয়েছে।


কারুকার্যময় হস্তশিল্পের প্রদর্শনী দেখে চোখ ধাঁধিয়ে গেলে মিউজিয়াম থেকে বেরিয়ে চলে আসুন ওয়েলিংটন দ্বীপে। দুই পারের সংযোগস্থাপনে আছে এক লম্বা ব্রিজ। এর উপর দিয়ে চলতে চলতে শহরের আকাশছোঁয়া অট্টালিকাগুলোর পাশাপাশি জাহাজ নির্মাণের কারখানাটিও দৃশ্যমান। ওয়েলিংটন দ্বীপে পৌঁছে মাত্তানচেরি প্যালেসে ঢুকে পড়ুন। অনেকে অবশ্য একে ডাচ প্যালেস নামেও চেনেন। নজরকাড়া কাঠের কারুকাজ, রামায়ণ-মহাভারত ও পৌরাণিক উপাখ্যানে চিত্রিত দেওয়াল ও ম্যুরাল চিত্র দেখে মুগ্ধতাকে সঙ্গী করেই পরবর্তী গন্তব্য জিউস টাউনে পৌঁছে যান।


ভারতের পশ্চিম উপকূলে ইউরোপীয় বণিকদের যাতায়াত শুরু হয়েছিল প্রায় ৫০০ বছর আগে। পর্তুগিজ, ইংরেজ, ওলন্দাজের পাশাপাশি ইহুদিদের স্মৃতি বহন করছে ‘জিউস টাউন’ অঞ্চল। অতীতে এখানে ইহুদিদের বাস ছিল। ইহুদি পাড়ায় হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ুন কোনও কিউরিও শপ বা হস্তশিল্পের বিপণিতে। দাম যদিও বেজায় চড়া। না কিনলেও,দেখতে ভালই লাগবে। এ ছাড়া, বড় বড় মশলার দোকানও আছে জমজমাট এই এলাকাতে। ইহুদিরা আজ আর না থাকলেও হিব্রু ভাষায় সাইনবোর্ডগুলি অতীতের সাক্ষ্য বহন করে।


কাছেই আর এক ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে  পর্তুগিজ বণিক ভাস্কো-দ্য-গামার বাসস্থানটি। তাঁর আগমনের সময়কালটি ছিল ১৫০২ সাল। পাশেই ভারতের প্রাচীনতম সেন্ট ফ্রান্সিস চার্চ। ১৫২৪ সালে এই চার্চেই ভাস্কো-দ্য-গামাকে সমাধিস্থ করা হলেও ১৪ বছর পর তাঁর কফিনটি তুলে নিয়ে যাওয়া হয় পর্তুগালে। চার্চ থেকে বেরিয়ে ক্র্যাফ্ট সেন্টার,মশলার দোকান, স্পা ও হার্বাল চিকিৎসা কেন্দ্রের পাশ দিয়ে পায়ে হেঁটে চলুন ফোর্ট কোচির দিকে। অতীতে পর্তুগিজদের তৈরি দুর্গটির আজ বিধ্বস্ত অবস্থা। কাছেই ব্যাকওয়াটার। লাইন দিয়ে ভেসে থাকা চাইনিজ ফিশিং নেটগুলি এর শোভা আরও বাড়িয়ে তুলেছে। জাহাজের আনাগোনা, জেলেদের ব্যস্ততা দেখতে দেখতে দিনের শেষে ফিশিং নেটের ফাঁক দিয়ে রোম্যান্টিক সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।


সন্ধ্যাটুকু উপভোগ্য হয়ে উঠুক কথাকলি নৃত্যানুষ্ঠানে। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে চলে আসুন কোচিন কালচারাল সেন্টারে। এ ছাড়া এর্নাকুলামে সি ইন্ডিয়া ফাউন্ডেশনেও প্রতি সন্ধ্যায় নাচের শো হয়। কেরলের মন্দিরগুলোতে পুজো উপলক্ষ্যে হাতির শোভাযাত্রা ও পঞ্চবাদ্যম্‌ (তিমিলা, মাড্ডালাম, ইলাথালাম, ইডাক্কা, কম্বু— এই পাঁচ বাদ্যযন্ত্রের অর্কেষ্ট্রা) অনুষ্ঠিত হয়। ভাগ্যে থাকলে এক অসাধারণ দ্রাবিড়ীয় কনসার্টের সাক্ষী হয়ে থাকবেন।

Comment As:

Comment (0)