লুসাই বাড়ির ঝিঁঝির ডাক

A+ A- No icon

সকাল-দুপুর-বিকাল-রাত বা যে কোনো সময়ে সাজেকের সব স্পটই স্পেশাল। সূর্যোদয়ের লাল আভা, জ্যোৎস্নাময় রাতের অপূর্ব রূপ বা সকালে সোনারোদের ঝলক ও শুভ্রসাদা মেঘের সারি কী আনন্দই না দেয়। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শীত সবকালেই সাজেক অনন্য। ঐতিহ্যবাহী লুসাই গ্রাম রুইলুই পাড়ায় হ্যালিপ্যাডের কাছেই। ৩০ টাকার প্রবেশ ফি দিয়ে উপভোগ করা যায় লুসাই বাড়ি ও গ্রাম। লুসাই পাহাড়ের একেবারেই পাদদেশে এ গ্রামের অবস্থান। রাতের বেলা ঝিঁঝি পোকার ডাকে মুখরিত।


প্রবেশমুখেই স্বাগত জানাবে লুসাই গ্রাম। এখানে লুসাই জনগোষ্ঠীর ধারণ করা কিছু পোশাক ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র পাবেন। দোকানদারবিহীন একটি দোকান আছে এখানে। ফলমূলাদি বা অন্যকিছু কিনতে পারবেন। সাজেক এলাকার একমাত্র গাছ বাড়ি বা ‘ট্রি হাউস’ লুসাই গ্রামেই পাবেন। গাছবাড়ি থেকে রাতে আকাশের তারা গোনার চেষ্টাও করতে পারেন। এক রাত থাকার জন্য ৪ হাজার টাকা ভাড়া। আরও কটেজ আছে। ভাড়া ২-৩ হাজার টাকা। এখান থেকে মেঘ ছুঁতে পারেন। দোলনায় দুলতে বেশ ভালোই লাগে। নবদম্পতির জন্য আদর্শ জায়গা। বাগান আর মেঘের মধ্যে থাকা যায়। ঐতিহ্যবাহী লুসাইদের কালচালার প্রোগ্রাম উপভোগ করা যায়। এজন্য চার্জ দিতে হয়। টাইমিং হলে প্রোগ্রামের আয়োজন করে কর্তৃপক্ষ। এখানে লুসাই উপজাতির পোশাক পরে ছবি তোলা যায়।


জনপ্রতি ফি তখন ৩০ থেকে বেড়ে ১০০ টাকা হয়। আদিবাসী খাবার উপভোগ করলে আলাদা করে অর্ডার দেয়া যায়। সাজেকের একমাত্র ট্রি হাউস রয়েছে লুসাই গ্রামে। রাত্রিযাপনের পাশাপাশি খাওয়া-দাওয়া, রাতে বারবিকিউ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ রয়েছে আরও অনেক আয়োজন। সাজেকে যেতে হলে স্থানীয় চান্দের গাড়িতে যেতে হবে। ১০-১৫ জনের ব্যবস্থা এক গাড়িতে। ভাড়া এক দিন-রাতের জন্য ৮,০০০ টাকা। ৩-৪ জনের মাহেন্দ্র ভাড়া ৪,০০০ টাকা। একজন বা দুজন থাকলে মোটরবাইকে ২ হাজার টাকা নেবে। সবক্ষেত্রে রিজার্ভ করতে হয় এবং সময়ভেদে ভাড়া কমবেশি হয়। চান্দের গাড়ি খাগড়াছড়ি বাসস্টেশনের কাছেই পাওয়া যাবে। মাহেন্দ্র/বাইক দীঘিনালায়ও পাওয়া যাবে। খাগড়াছড়ি বা দীঘিনালায় থাকা ও খাওয়ার চমৎকার সব ব্যবস্থা আছে। বিভিন্ন বাজেটের ব্যবস্থায় ইচ্ছামতো পছন্দ করতে পারবেন।


যাতায়াতের সময়সূচি : সাজেকে যেতে হলে বাঘাইহাট আর্মিক্যাম্প থেকে নাম এন্ট্রি করতে হবে। গাড়িও এন্ট্রি করতে হবে। পর্যটকরা দিনে দু’বার সাজেক এলাকার দিকে যেতে পারবেন। সকাল ১০টায় ও বেলা ৩টায় বাঘাইহাট ক্যাম্প থেকে একত্রে যাত্রা করতে হবে। ফেরার সময় রুইলুই পাড়ায় উল্লিখিত একই সময়ে এন্ট্রি দেখিয়ে যাত্রা শুরু হবে। যাওয়া-আসা উভয়ক্ষেত্রে মাসালং আর্মিক্যাম্পে রি-চেকিং হবে। সাজেকগামী বা দীঘিনালাগামী উভয় পর্যটক মাসালং-এ একত্রিত হন। মিলনমেলা বলা যায়। উভয়ক্ষেত্রে পুলিশস্কর্টের মাধ্যমে নিয়ে যাওয়া হয়। আর্মিরা মোড়ে মোড়ে থাকেন। দারুণ লাগে এ অনুভূতি।


পাহাড়ি খাবার খাওয়া যাবে এ পর্যটন এলাকায়। পাহাড়ি মুরগির মাংসের স্বাদ ভালোই লাগে। এ এলাকা ব্যাম্বু চিকেনের সুবাসে ভরপুর। পেঁপে খেতে দারুণ মজা। নরম আখের রস সস্তায় পাবেন। পাহাড়ি আদিবাসীদের নৃত্য/সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান খুব ভালো লাগে। অর্ডার দিয়ে এসব খাবার/অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হয়। কলার স্বাদ নিতে ভুল করা যাবে না। পুরো এলাকায় মাঝেমধ্যে পথের ধারে পাহাড়ি ফলমূল/জিনিসের পসরা বসায় পাহাড়ি মেয়েরা। রুইলুই পাড়ায় লুসাই মেয়ের হাতের ‘ব্যাম্বু টি’ খেতে ভিড় থাকে। রাতের বেলায় বেশি ভিড় থাকে।


সতর্কতা : পাহাড়িদের ছবি তোলার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে মেয়েদের। আর্মিক্যাম্প এলাকায় ছবি তোলা নিষিদ্ধ। এ এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। সৌরবিদ্যুৎ রয়েছে। অতিরিক্ত মোবাইল/ক্যামেরা ব্যাটারি বা চার্জার ব্যাংক নিতে হবে। চার্জ দেয়ার সুবিধার্থে সীমিত সময়ের জন্য কটেজ/হোটলে জেনারেটর চালু করেন সংশ্লিষ্ট আবাসিক কর্তৃপক্ষ।


যাতায়াত : চট্টগ্রামের অক্সিজেন মোড় থেকে খাগড়াছড়িগামী বাস পাবেন। সময় লাগবে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা। বায়েজীদ বোস্তামি থেকে শান্তি পরিবহনে গেলে সময় কম লাগবে। আরামদায়কও হবে। ভাড়া একটু বেশি পড়বে। ২০০ টাকা। এছাড়া ঢাকার গাবতলী/সায়েদাবাদ থেকে সকাল ও রাতে খাগড়াছড়িগামী বিভিন্ন পরিবহন পাবেন। ভাড়া ৫৫০ টাকা। ট্রেনে চট্টগ্রামে গিয়ে তারপর বাসে খাগড়াছড়ি যেতে পারবেন। এরপর চান্দের গাড়িতে রুইলুই পাড়া। দূরত্ব প্রায় ৫০ কিমি।


থাকা ও খাওয়া : থাকা ও খাওয়ার জন্য রুইলুই পাড়ায় রিসোর্ট আছে। লুসাই গ্রামে ৩-৪ হাজার টাকায় গাছ বাড়িতে থাকতে পারবেন। লুসাই পাহাড়ের পাদদেশে সবুজ অরণ্যঘেরা কটেজে থাকার অনুভূতিই আলাদা। মেঘের মধ্যেই থাকা যাবে। মেঘ দেখা যাবে, ছোঁয়া যাবে, ধরা যাবে! আদিবাসীদের কুটিরেও থাকতে পারবেন। দামদর ঠিক করে কটেজ/কুটিরে থাকা যাবে। ছুটির দিনে ও পিক সিজনে বুকিং দিয়ে যাওয়াই ভালো। বিভিন্ন দাম-মানের রিসোর্ট বা কটেজ রয়েছে পুরো এলাকায়।

Comment As:

Comment (0)