চীনা পণ্য কিনতে ব্যয় বাড়ছে ভোক্তার

A+ A- No icon

করোনাভাইরাস এবার দেশের ভোক্তাদের চাপ ফেলতে শুরু করেছে। কারণ খাদ্যপণ্য সহ ভোক্তার ব্যবহার্য অনেক পণ্য আসে চীন থেকে। কিন্তু দেশটিতে নতুন এই ভাইরাস আক্রমণের পর তাদের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী চীন থেকে পণ্য আনা যাচ্ছে না। কিছু পণ্য এলেও সময় লাগছে অনেক। এই সুযোগ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা আদা, রসুন, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে তৈরি পোশাক, মেশিনারি পণ্য ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই এ সব পণ্য কিনতে ভোক্তার বাড়তি ব্যয় হচ্ছে।

 

বাংলাদেশে মেশিনারিজ, কাপড়, কেমিক্যালসহ পোশাক খাতের অনেক কাঁচামাল আসে চীন থেকে। দেশটিতে নতুন বছরের ছুটি ও করোনাভাইরাসের কারণে এসব পণ্যের আমদানির পরিমাণ অনেক কমে গেছে। এতে দেশীয় কারখানাগুলোতে উৎপাদনে ব্যাহত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে রফতানি খাতে বড় ধরনের ধাক্কার শঙ্কা আছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার বিকল্প বাজারের সন্ধান করছে। এজন্য ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর কাছে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।

 

এগুলো নিয়ে খুব শিগগিরই ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসার প্রক্রিয়াও চলছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র জানায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে চীন থেকে পণ্য আমদানি হয় ৬ লাখ ৭২ হাজার ৯৫২ টন। যা গত বছরের একই সময় (২০১৯ সালের জানুয়ারি মাস) আমদানি হয় ৮ লাখ ৫১ হাজার ২৫৫ টন। দেখা যায় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি কম হয়েছে এক লাখ ৭৮ হাজার ৩০৩ টন। এছাড়া চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ৮ তারিখ পর্যন্ত চীন থেকে পণ্য আমদানি হয়েছে এক লাখ ৩৭ হাজার ৫৭৯ টন।

 

গত বছরের একই সময় আমদানি হয় ২ লাখ ১৯ হাজার ১৪৯ টন। সেক্ষেত্রে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানি কম হয় ৮১ হাজার ৫৭০ টন। রাজধানীর কারওয়ান বাজার, নয়াবাজার, শান্তিনগর কাঁচাবাজার ঘুরে ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চীন থেকে আমদানিকৃত আদা বিক্রি হচ্ছে ১৫০-১৬০ টাকা কেজি দরে। যা তিন সপ্তাহ (২১ দিন) আগে বিক্রি হয়েছে ১২০-১৩০ টাকা কেজি। রসুন বিক্রি হয়েছে ২০০-২২০ টাকা।

 

যা তিন সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ১৪০-১৫০ টাকা। এছাড়া এক মাস আগে চীনা পেঁয়াজ বাজারে অহরহ পাওয়া গেলেও বর্তমানে কম পাওয়া যাচ্ছে। এ দিন বাজারে প্রতি কেজি চীনা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৮০-৯০ টাকা। যা এক মাস আগে ৪৫-৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া চীন থেকে আসে বিলাসী বেশ কয়েক ধরনের খাদ্যপণ্য। চীন থেকে আমদানি করা এসব পণ্যের এখন জোগান কম বলছেন বিক্রেতারা। এর মধ্যে বেবি কর্ন, সুইটকর্ন, ফিশ সস, মাকুরা সস, মাশরুমসহ এসব পণ্যের সরবরাহ কম থাকায় বাড়ছে দাম।

 

নয়াবাজারের বিক্রেতা মো. আলাউদ্দিন বলেন, চীন থেকে বর্তমানে আদা, রসুন ও পেঁয়াজ আসছে না। যে কারণে আমদানিকারক ও পাইকারি বিক্রেতারা বেশি দরে বিক্রি করছে। আর বেশি দাম দিয়ে কিনে আমাদেরও বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। এছাড়া চীন থেকে আসা বিভিন্ন ধরনের খাবারের দামও বাড়তে শুরু করেছে। তিনি বলেন, পেঁয়াজের মতো আদা, রসুনেও যাতে ত্রিপল সেঞ্চুরি না হয় সেদিকে সরকারকে এখন থেকেই ভাবতে হবে। এজন্য চীন বাদে অন্যান্য দেশ থেকে পণ্যগুলো আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে হবে।

 

কারণ সামনেই রমজান। অন্যদিকে রাজধানীর পাইকারি পোশাকের মার্কেটগুলোতে চীন থেকে আমদানিকৃত পোশাকের দাম বাড়ছে। সদরঘাটের পাইকারি হকার্স মার্কেটে পোশাক কিনতে আসা সাভারের খুচরা ব্যবসায়ী মো. মাসুম যুগান্তরকে বলেন, পাইকারি বিক্রেতারা বলছেন- চীন থেকে আমদানি করা তৈরি পোশাক এখন আসছে না। অনেক আমদানিকারক অর্ডার দিয়ে রাখলেও পণ্য আসতে বিলম্ব হচ্ছে। এতে শোরুমগুলোতে চীনের পোশাকে এক ধরনের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। যার কাছে আছে তারাও বাড়তি দরে বিক্রি করছে।

 

তিনি বলেন, গত মাসে প্রতি পিস চীনা জিন্সের প্যান্ট ৬০০-৭০০ টাকায় কিনে নিয়ে গেছি। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৮০০-১০০০ টাকা। আর এই প্যান্ট খুচরা শোরুমে নিয়ে লাভসহ বিক্রি করতে হবে। এতে ভোক্তার বাড়তি খরচ হবেই। ঢাকার পাটুয়াটুলির ঘড়ির দোকান ভাই ভাই ওয়াচ কোং-এর মালিক মো. ইব্রাহিম বলেন, দেড় মাস আগে চীনে গিয়ে ঘড়ি ক্রয় আদেশ দিয়ে এসেছি। যা ১৫-২৫ দিনের মধ্যে দেশে আসার কথা। কিন্তু এখন পর্যন্ত আসেনি। কবে নাগাদ আসবে তাও জানি না।

 

তিনি বলেন, এখানের ব্যবসায়ীরা বেশির ভাগ চীনা ঘড়ি বিক্রি করেন। আর খুব অল্প পরিমাণে ভারত থেকে আমদানি করে বিক্রি হয়। তাই করোনাভাইরাসের আক্রমণের পর চীন থেকে ঘড়ি আসা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই চাহিদার তুলনায় জোগান কম থাকায় দাম একটু বেড়েছে। কারণ যেসব পাইকারের কাছে আগে আনা ঘড়ি আছে, তারা একচেটিয়া বাণিজ্য করছে। দাম বাড়িয়ে বিক্রি করছে। এতে খুচরা পর্যায়েও সব ধরনের ঘড়ির দাম বেড়েছে।

 

রাজধানীর গুলিস্তান বায়তুল মোকাররম ইলেক্ট্রনিক্স মার্কেটে গিয়ে দেখা গেছে, যেসব সিডি প্লেয়ার আগে দুই হাজার টাকায় পাওয়া যেত, বিক্রেতারা সেই সিডি প্লেয়ারের দাম ২৫০০ টাকা হাঁকাচ্ছেন। এছাড়া চীনা ৩২ ইঞ্চি টিভি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকায় পাওয়া গেলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকায়। মার্কেটের বিক্রেতারা বলছে, আমদানিকারক ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে মালামাল নেই। তারা হঠাৎ করে দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

তারা বলছেন, চীনে করোনাভাইরাসের আক্রমণের কারণে দেশটি থেকে ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য আসছে না। যে কারণে দাম বাড়তি। এতে আমাদের বেশি দাম দিয়ে এনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। এদিকে স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশনের (বিএসটিআই) তথ্য বলছে, বাংলাদেশ চীন থেকে বাটার, কনডেন্সড মিল্ক, ডেক্সট্রোজ মনো-হাইড্রেট, লিকুইড গ্লুকোজ, মধু, মাস্টার্ড অয়েল, ক্যান্ড পাইনাপেল, চকোলেট, কোকোনাট অয়েল, রিফাইন সুগার, সুজি, মিল্ক পাউডার, ক্রিম পাউডারসহ ১৮১টি পণ্য আমদানি করে। করোনার কারণে এ ধরনের অনেক পণ্য আমদানি হচ্ছে না। ফলে বাজারে এগুলোর দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Comment As:

Comment (0)