মিশরীয় সব মূর্তির নাক ভাঙার জটিল রহস্য উন্মোচন

A+ A- No icon

প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার কথা শুনলে প্রথমেই পিরামিড, স্ফিংস কিংবা ফারাওদের মমির কথা মনে পড়ে। কয়েক হাজার বছরের পুরাতন এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো এখনো সবার কাছে বিস্ময়কর এবং কৌতূহলের বিষয় হয়ে আছে। তবে এগুলো ছাড়াও প্রাচীন মিশরীয়রা শৈল্পিক নিদর্শনের জন্যও বিখ্যাত। তারা অসংখ্য মূর্তি খোদাই করেছিল। প্রাচীন মিশরে ফেরাউন, দেব দেবী, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব এবং সম্পদশালী নাগরিকদের মূর্তি খোদাই করা হত। বিভিন্ন প্রাণীর মূর্তিও ছিল এর মধ্যে। বিভিন্ন শ্রেণির ব্যক্তি এবং প্রাণীর মূর্তি খোদাই করা হলেও একটি বিষয় প্রায় সব মূর্তির মধ্যেই অবশিষ্ট। তা হলো মূর্তিগুলোর নাক ভাঙা।


মিশরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত জাদুঘরে প্রাচীন মিশরীয় বিভিন্ন মূর্তি প্রদর্শিত হয়। এসব প্রদর্শনীতে আসা দর্শনার্থীদের প্রায় সবারই সাধারণ প্রশ্ন থাকে মূর্তিগুলোর নাক ভাঙা কেন? অনেকের হয়তো মনে হতে পারে তৈরির সময় কোনো কারণে মূর্তিগুলোর নাক ভেঙে গিয়েছিল। তবে এমন কিছু ঘটেনি কারণ একই কারণে সব মূর্তির নাক ভাঙবে না। কোনো দুর্ঘটনার জন্যেও এমনটি হয়নি কারণ দুর্ঘটনা ঘটলেও শুধু নাকই বা ভাঙবে কেন? খনন করে উদ্ধারের সময়ও মূর্তিগুলোর নাক ভাঙেনি বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। মূর্তিগুলোর নাক ভাঙার পেছনে প্রাচীন মিশরীয়দের বিশ্বাস কারণ হিসেবে বিদ্যমান বলে জানা যায়। প্রাচীন মিশরীয়রা বিশ্বাস করতেন মূর্তির মধ্যে জীবন আছে। তারা কখনোই ভাবতেন না মূর্তিগুলো শুধুই জড় পদার্থ। সবার অগোচরে মূর্তিগুলো চলাফেরা করত বলেও তাদের বিশ্বাস ছিল। 


এসব মূর্তিরা তাদের ক্ষতি করতে পারে, এমন মনোভাব জন্মে মিশরীয়দের। যে কারণে প্রাচীন মিশরীয়রা মূর্তিগুলো হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। আর মূর্তিগুলো হত্যা করার জন্য নাক ভেঙে ফেলেন। তারা বিশ্বাস করতেন নাক কেটে ফেললে এসব মূর্তি শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে না পেরে মারা যাবে। নাক ভেঙে ফেলার আরো একটি কারণ ছিল নাকের মধ্য দিয়ে মূর্তিগুলো জীবন পেত বলে বিশ্বাস প্রচলিত ছিল তাদের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রাচীন মিশরে ফারাও, ক্ষমতাধর, সম্পদশালী ব্যক্তিদের মূর্তি তৈরি করা হত। তাদের বেঁচে থাকা অবস্থায় মূর্তির নাক কাটা হতো না। তবে এব ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের মৃত্যুর পর তাদের শক্তি যাতে অপশক্তিতে পরিণত না হতে পারে সেজন্য মূর্তির নাক ভেঙে দেয়া হত।  অনেক সময় মূর্তির শক্তি নিষ্ক্রিয় করতে নাক ছাড়াও মুখ, হাত, পা এবং পেটের অংশও ভেঙে দেয়া হত। এই ভ্রান্ত বিশ্বাস পুরো মিশরে ছড়িয়ে পড়েছিল। যে কারণে প্রাচীন মিশরের বেশিরভাগ মূর্তির নাক ভাঙা। প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনেকেই মনে করেন, প্রাচীন মিশরের মূর্তিগুলোর নাক ভাঙার জন্য এই ভ্রান্ত ধারণা ছাড়াও ধর্মীয় কারণও বিদ্যমান ছিল। 


খ্রিষ্টীয় প্রথম থেকে তৃতীয় শতক পর্যন্ত মিশরের সবাই খ্রীষ্ট ধর্ম পালন করত। এর পূর্বে বিভিন্ন দেব-দেবীর মূর্তি পূজা হত। খ্রীষ্ট ধর্ম প্রচলিত হওয়ার পর বিভিন্ন স্থানে মূর্তিগুলো হামলার শিকার হতে থাকে। যে কারণে অনেক ভাস্কর নিজের তৈরি মূর্তি সংরক্ষণের চেষ্টা করে। কিছু প্রত্নতত্ত্ববিদ মনে করেন, তারা ভুলভাবে সংরক্ষণ করায় অনেক মূর্তির নাক ভেঙেছিল। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতকে মিশরে ইসলাম ধর্ম পালিত হতে থাকে। সে সময় অনেকে মূর্তি খণ্ড খণ্ড করে ভেঙেছিল। তবে অনেক মতবাদ প্রচলিত থাকলেও প্রাচীন মিশরের অধিকাংশ নাক ভাঙার কারণ হিসেবে মূর্তির জীবনী শক্তি বিনাশ করার বিষয়টি যুক্তি সঙ্গত বলে বেশিরভাগ প্রত্নতত্ত্ববিদ মনে করেন।

Comment As:

Comment (0)