সেলুনে বসে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা: সিয়াম

A+ A- No icon

সিয়াম আহমেদ চলচ্চিত্রের ক্যারিয়ারে অভিনয় করেছেন তিনটি ছবিতে। এরমধ্যে ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ছবিতে ‘নাসির’ চরিত্রের মূল্যবোধ তৈরি থেকে শুরু করে অনেক বিষয়ে আলাদাভাবে কাজ করতে হয়েছে তাকে। এ চরিত্রে হিরোয়িজম নেই। লুক তৈরির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিয়েছেন। বাণিজ্যিক ছবি দিয়ে ক্যারিয়ারের যাত্রাটা শুরু হলেও এ ছবিটা না করতে পারলে তার ‘আফসোস’ থেকে যেত বলে মনে করেন সিয়াম।


মহান ভাষা দিবসের তাৎপর্য, ভাষাসৈনিকদের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে খুব একটা ফুটে ওঠেনি। বিস্ময়কর হলেও মাত্র দুটি ছবির মধ্যেই আটকে আছে আমাদের ভাষা আন্দোলনের ক্যানভাস। একটি জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’, আরেকটি শহীদুল ইসলাম খোকনের ‘বাঙলা’। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট নিয়েই তৈরি হয়েছে ‘ফাগুন হাওয়ায়’। ১৫ ফেব্রুয়ারি দেশের ৫২টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে এটি। ছবিটি নির্মাণ করেছেন তৌকীর আহমেদ।


সিয়াম বলেন, ‘ছবিটিতে চরিত্রের ম্যানারিজম ও সাধারণ মূল্যবোধ তৈরি করার বিষয়টা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এটা তৈরি করতে অনেকটা সময় লেগেছে। কারণ চরিত্রের মধ্যে কোনো এক্সট্রা হিরোয়িজম নেই। ওর হিরোয়িজম হচ্ছে ওর মূল্যবোধ। এরপর চরিত্রের লুক বিল্ডআপ নিয়ে কাজ করেছি। এই সময়টা বেশ কঠিন ছিল।’ ‘লুক সেটআপের জন্য আমাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেলুনে বসে থাকতে হয়েছে। একেকটা লুক সেট করতাম আর তৌকির ভাইকে ছবি পাঠাতাম। এভাবে বেশ কয়েকদিন চেষ্টা করার পরও কাজ হচ্ছিল না। এরমধ্যে হঠাৎ করে একদিন পুরনো একটা পাসপোর্টের মধ্যে আমার বাবার একটা ছবি খুঁজে পাই। বাবা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিল, তখনকার সময়ের একটি ছবি।’


এই অভিনেতা জানান, বাবার ছবিটি দেখার পর তার মনে হয়েছে তিনি ছবিটির সঙ্গে নিজেকে রিলেট করতে পেরেছেন। তারপরই তিনি ওই লুকটা নেওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর ওই লুকটা সেট করার পর একটি ছবি নির্মাতা তৌকির আহমেদকে পাঠান। ছবিটি দেখে তিনি বললেন, ‘আমরা মনে হয় পেয়েছি।’ তখন সিয়াম লুক ফিক্সড করেন। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর সিয়াম আহমেদ নির্মাতা তৌকীর আহমেদের সঙ্গে চিত্রনাট্যের খুঁটিনাটি দিকগুলো নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা করেন। নির্মাতার নির্দেশনা অনুযায়ী, সিয়াম নিজেকে পরিচালিতও করেন।


একটা সময় গিয়ে নির্মাতা নাসিরের একটা বায়োগ্রাফি তৈরি করতে দেন সিয়ামকে, সেটাও সিয়াম সফলভাবে সম্পন্ন করেন। তবে নাসির চরিত্রটি তৈরি করতে অভিনেতা আজাদ আবুল কালামও ভূমিকা রেখেছেন বলে জানান সিয়াম। তিনি বলেন, ‘এ ছবির কাজটা করতে গিয়ে মনে হয়েছে, একটা এডুকেশনাল জার্নিতে ছিলাম। এই সিনেমাতে প্রচুর পরিমাণে হিউমার আছে। এটা বিনোদনধর্মী একটা সিনেমা। এখানে দুই-আড়াই ঘণ্টা বসে থেকে বিরক্ত হওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। আমরা এখানে মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করেছি। যদিও আমরা ভাষা আন্দোলনের ওপর পূর্ণাঙ্গ একটা ফিল্ম অনেক দিন পরে পেতে পাচ্ছি।’


অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে কাজ করতে হয়েছে জানিয়ে সিয়াম বলেন, ‘তারপরও সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে কাজটা করার চেষ্টা করতেছি। আমি আমার ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত আমি কখনো ক্রিটিসিজমে ভয় পাই নাই। কারণ ওই ক্রিটিসিজমটাই কিন্তু আজকের এ অবস্থানে আমাকে নিয়ে এসেছে। আমি গঠনমূলক সমালোচনা হলে মাথায় নেব। অন্যকিছু আমার মাথায় নেওয়ার প্রশ্নই উঠে না।’ ‘অভিনেতা-নির্মাতাদের জীবনটাই কিন্তু এমন। প্রশংসা নেওয়ার সময় যেমন আমাদের বুক গর্ভে ফুলে যায়, তেমনই ক্রিটিসিজমের সময়ও মাথা নিচু করে সেটা শোনা প্রয়োজন। কারণ সেটাই আমাদের পরে আরেকটা বেটার কাজ করতে সহযোগিতা করবে।’


অভিনেতা বলেন, ‘যারা ছবিটাকে ওজনদার ভাবছে, মাথার ওপর দিয়ে যাবে ভাবছে, তারা সিনেমাটি দেখতে গিয়ে অনেক শকড হবে। এটা তো তৌকির ভাইয়ের ষষ্ঠ চলচ্চিত্র। এর আগের যে পাঁচটা চলচ্চিত্র তিনি বানিয়েছেন, সেগুলোর কোনোটাইতে এত বেশি হিউমার ছিল না। তবে এই হিউমারটা স্মার্ট। সুড়সুড়ি দেওয়ার মতো না। সিচুয়েশন যেটা ডিমান্ড করেছে, সেটাই করা হয়েছে।’ সিয়াম যখন ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন, তখন তার কাছের অনেকেই বলেছেন, ‘তুমি মাত্র দুটো কমার্শিয়াল সিনেমা করলা, তোমার তো উচিত কমার্শিয়াল হিরো হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তোমার কী মনে হয়েছে এ ধরনের ছবি করা ঠিক?’


সিয়াম বলেন, ‘কাজটা না করলে আমার একটা আফসোস থেকে যেত। আমি অ্যাক্টর হিসেবে এখানে সেলফিস ডিসিশন নিয়েছি। আমার কাছে মনে হয়েছে এ চরিত্রটা যেহেতু আমার জেনারেশন থেকে আমার কাছে এসেছে, আমার কাজটা করা উচিত।’ নাসির চরিত্রটির জন্য পাঁচ কেজি ওজন বাড়িয়েছিলেন সিয়াম। তিনি বলেন, ‘চরিত্রটা এমনই, যাকে দেখলে মানুষ ভাববে সে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে সে স্লোগান দিতে পারে। মানে ফিজিক্যাল অ্যাপারেন্সটা দরকার ছিল। ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন থেকে এ ছবিতে আমার বেশি পরিশ্রম গিয়েছে আমার ভয়েজ চেঞ্জ করতে। আমার ভয়েজটা নিয়ে আমাকে অনেক কাজ করতে হয়েছে।’


এখন পর্যন্ত যে কয়েকটি ছবিতে সিয়াম অভিনয় করেছেন, তারমধ্যে ‘ফাগুন হাওয়ায়’ সবচেয়ে কম ডায়লগ ছিল। এটা তার জন্য একদমই নতুন অভিজ্ঞতা ছিল বলে জানান তিনি। ‘ফাগুন হাওয়ায়’ অভিনয় করতে গিয়ে তাকে আলাদা করে ভাষার ব্যবহার নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। কারণ ভাষার দিক থেকেও ১৯৫২ সালের সময়টাকে তুলে ধরতে হয়েছে। ভাষার ওই সৌন্দর্য্যবোধটা ধরে রাখতেই তাকে এ দিকটা নিয়ে আলাদা করে ভাবতে হয়েছে। ভাষা আন্দোলন কিংবা এমন ধরনের বিষয়ভিত্তিক ছবি নির্মাণে প্রযোজকদের ভূমিকা আরও সচল হওয়া উচিত বলেও মনে করেন তিনি।

Comment As:

Comment (0)