সৌন্দর্যের কিছু কথা

A+ A- No icon

মানুষ সুন্দরকে পছন্দ করে। নিজেকে সবার মধ্যে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করার ইচ্ছঅ থেকেই মানুষ সৌন্দর্যচর্চা করে। প্রসাধনী দেহের বাইরের পরিচর্যা। সৌন্দর্যের মূল উৎস দেহের ভেতর। তাই বাইরের পরিচর্যার সঙ্গে দেহের ভেতরের পরিচর্যাও প্রয়োজন। কিছু অভ্যাস বা সতর্কতাই আমাদের দেবে সুস্থ, সুন্দর ও আকর্ষণীয় চেহারা। সতর্কতাগুলো নিচে দেওয়া হলো।


ত্বক: সৌন্দর্যের অন্যতম প্রধান শর্ত উজ্জ্বল-মসৃণ ত্বক। এ ত্বককে সুন্দর রাখার জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি (প্রতিদিন অন্তত দেড় লিটার) পান করুন। যত বেশি পানি পান করবেন, আপনার রক্তসঞ্চালন তত বেশি পরিষ্কার ও দ্রুত হবে। ফলে দেহের প্রতিটি অঙ্গে রক্ত পৌঁছাবে। দেহের প্রতিটি অঙ্গ সঠিকভাবে কাজ করবে। ফলে ত্বক হবে সতেজ। মানুষের মাথা ও মুখে স্নায়ু, শিরা-উপশিরার পরিমাণ আয়তন অনুযায়ী অনেক বেশি। তাই যত বেশি পরিমাণে দেহের অন্য অঙ্গগুলো সচল থাকবে, তত বেশি পরিমাণে মস্তিষ্ক কাজ করবে, ত্বক উজ্জ্বল হবে। তাই বেশি করে পানি ও তরল খাবার খান। তবে সফট ড্রিংকস বা কোমল পানীয় বর্জনীয়?। কারণ কোমল পানীয়ে উচ্চ ক্যালরি রয়েছে। রোদে ক্ষতিকর আলট্রাভায়োলেট রশ্মি থাকে, যা ত্বকের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর। তাই রোদ থেকে দূরে থাকুন। আমাদের ত্বকে মৌমাছির কুঠুরির মতো অসংখ্য ছিদ্র রয়েছে, যা খালি চোখে দেখা যায় না। দেহে তৈলাক্ত খাবারের পরিমাণ বেড়ে গেলে ত্বকের ছিদ্র দিয়ে তেল নিঃসরণ হয়। এ তেলের সঙ্গে ধূলা জমলে ত্বকের ছিদ্রগুলো বন্ধ হয়ে যায়। তখন মুখে ব্রণ, মেছতাসহ বিভিন্ন ধরণের দাগের সৃষ্টি হয়। তাই দেহের গড়ন বুঝে তৈলাক্ত খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। ত্বকের ঔজ্জ্বল্যের জন্য প্রচুর পরিমাণে কাঁচা সবজি, মৌসুমি ফল, শাক ও তেতো খাবার খান। কালোজিরা, মেথি, পুদিনার পাতা, চিরতার রস, লেটুসপাতা ত্বকের কুঁচকে যাওয়া এবং বলিরেখা দূর করে। তাই সপ্তাহে অন্তত এক দিন এ খাবারগুলো গ্রহণের অভ্যাস করুন।


চোখ: প্রতিদিন সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে বাইরে থেকে এসেই চোখ খোলা রেখে স্বাভাবিক পানিতে চোখ ধুলে ফেলুন। অখ্যাত কোম্পানির আইশ্যাডো, মাশকারা বা কাজল ব্যবহার করবেন না। সবুজ গাছপালার দিকে বেশি তাকান। প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমান। সবুজ শাকসবজি, ছোট মাছ চোখের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করে। তাই এসব খাবার বেশি করে খাবেন। যারা চোখের পরিশ্রম বেশি করেন, তারা প্রতিদিন অন্তত টানা ৩০ মিনিট চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকুন। এতে চোখ ও ভ্রুর নিচের মাংসপেশিগুলোর বিশ্রাম হবে। ফলে চোখের পাপড়ি, চোখের নিচের অংশ ও ভ্রুর চারপাশের মাংপেশি দীর্ঘ বয়স পর্যন্ত টানটান থাকবে, সংকুচিত হবে না।


ভ্রু: ভ্রু গজানো দেহের হরমোনের ওপর নির্ভর করে। কারও দ্রুত বা দেরিতে ভ্রু গজায়। নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে ভ্রু প্লাক করুন। নিয়মিত ভ্রু তুললে ভ্রুর মাংসপেশি বয়ঃপ্রপ্তিতে চোখের ওপর ঝুলে পড়বে। চোখের নিচের ত্বক: পেপটিক আলসার ও অম্লের রোগীদের চোখের নিচে কালো হয়ে যায়। মোটা ও ভারী কাচসমৃদ্ধ চশমাতে চোখের নিচের ত্বক বসে যায়। তাই পেপটিক আলসার ও অম্লের রোগীরা চিকিৎসকের সাহায্য নিন। মোটা কাচের চশমা পরিহার করুরন। দুশ্চিন্তা, অতিরিক্ত রাত জাগা, কড়া লিকারের চা বা কফি, মাদকদ্রব্য, তামাক, বিড়ি, সিগারেটের জন্য চোখের নিচের ত্বক কালো হয়ে যায়। তাই এ অভ্যাসগুলো পরিহার করুন। হঠাৎ অতিরিক্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও ডায়রিয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে চোখের নিচে। তাই ধীরে ধীরে খাবার নিয়ন্ত্রণ করুন। ডায়রিয়া হলে খাওয়ার স্যালাইনসহ অন্যান্য তরল খাবার প্রচুর পরিমাণে খাবেন।


ঠোঁট: নিয়মিত গাজর, আঙুর খান। আর খালি পেটে দাঁত ব্রাশ করার পর হালকা বা কুসুম গরম পানিতে (এক গ্লাস) এক চা চামচ মধু মিশিয়ে খান। এ তিনটি খাবার ঠোঁটের মসৃণতা বাড়ায়। যত বেশি পানি খাবেন, ঠোঁটে রক্ত চলাচল ততই বাড়বে। ফলে ঠোঁট লালচে দেখাবে। ধূমপায়ী ও অতিরিক্ত এসিডিটির রোগীদের ঠোঁট কালো হয়ে যায়। তাই ধূমপান বর্জনীয়। এসিডিটির রোগীরা তৈলাক্ত, ভাজা-পোড়া খাবার কম খাবেন। অনেকের সারা বছর ঠোঁট ফাটে। ঠোঁটের চামড়া উঠতেই থাকে। দেহে সোডিয়াম, ক্লোরিন আর পটাশিয়ামের অভাবে ঠোঁট ফাটে। তবে শীতকালে ঠোঁট ফাটে আবহাওয়া শুষ্ক হওয়ার কারণে। তাই যাঁদের সারা বছর ঠোঁটের চামড়া উঠতে থাকে, তাঁরা সপ্তাহে অন্তত এক দিন বা মাসে দুই দিন খাওয়ার স্যালাইন খাবেন। আপার লিপ বা লোয়ার লিপের লোম গজানোর ভিত্তিতে থ্রেডিং করুন। থ্রেডিংয়ের সুতা যেন অবশ্যই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে। (ডায়াবেটি, উচ্চ কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপের রোগীরা মধু খাবেন না।)


দাঁত: প্রতিবছর স্কেলিং করাবেন। শর্করা বা স্নেহজাতীয় খাবার খেলেই দাঁও ব্রাশ করুন। একটানা টুথপেস্ট ব্যবহার না করে মাঝেমধ্যে টুথ পাউডার ব্যবহার করুন। টুথ পাউডার দাঁতের প্রতিটি গোড়ার ফাঁকে যাবে। যাদের দাঁত বাঁকা, তারা সুবিধামতো পাউডার ব্যবহার করুন। দাঁতের ঔজ্জ্বল্য বাড়ানোর জন্য প্রচুর পরিমাণে ছোট মাছ খান। ক্যালসিয়াম ও আয়োডিনসমৃদ্ধ খাবার খান। এ খাবারগুলো দাঁতের গোড়া মজবুত করে। দাঁতের মসৃণতা বাড়ায়। ধূমপান, মাদক, গুল দাঁতের ঔজ্জ্বল্য নষ্ট করে। তাই এসব বর্জনীয়। প্রতিদিন অন্তত একটা ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত ফল খান। ভিটামিন ‘সি’ দাঁতের মাঢ়িকে রক্ষা করে। অনেকেরই দাঁতের মাঢ়ি কালো হয়ে যায়, কথা বললে বা হাসলে যা দৃষ্টিকটু লাগে। এ সমস্যায় আক্রান্তরা লেবুর শরবত খাবেন। সমস্যা তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। মুখের দুর্গন্ধ দূর করার জন্য গরম মসলা, এলাচ চিবাতে পারেন। খাবার ঠিকমতো হজম না হলে বা পাকস্থলীতে কোনো সমস্যা থাকলে মুখে দুর্গন্ধ হয়। তাই খাবার দীর্ঘসময় ধরে ঠিকমতো চিবিয়ে খাবেন।


জিহ্বা: অনেকের জিহ্বায় সাদা আবরণ পড়ে। কথা বলার সময় ভীষণ বিশ্রী দেখায়। গ্যাস্ট্রিকের রোগীদের জিহ্বায় দাগ হয় বেশি। গ্যাস্ট্রিকের রোগীরা প্রচুর পানি পান করুন। আর জিহ্বা নিয়মিত পরিষ্কার রাখুন। ভিটামিন ‘সি’র অভাবে জিহ্বায় দানা দানা লালাচে ঘা হয়। এ জন্য ভিটামিন ‘সি’ যুক্ত খাবার খানে।


চুল: চুলের গোড়ায় যেন ঘাম বা পানি না জমে সেদিকে খেয়াল রাখুন। হজমে সমস্যা না থাকলে এবং উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল না থাকলে প্রতিদিন এক কাপ দুধ খান। দুখের মধ্যে ভিটামিন ‘সি’ বাদে সব ধরনের ভিটামিন রয়েছে। দুধ ত্বক ও চুলের পুষ্টি বাড়ায়। চুলের মসৃণতা বৃদ্ধির জন্য ভিটামিন এ, সি, ডি, ই যথেষ্ট উপকারী। সূর্যের আলো, সামুদ্রিক মাছে ভিটামিন ‘ডি’ রয়েছে। তবে চুলে অধিক পরিমাণ সূর্যের তাপ লাগলে চুল রুক্ষ হয়ে যাবে। ভিটামিন ‘ই’র জন্য ডিমের কুসুম, মাখন, সবজির তেল, (সানফ্লাওয়ার ওয়েল, অফিলভ ওয়েল প্রভৃতি) কাজুবাদাম, খোসাযুক্ত সবুজ সবজি খান। লক্ষ রাখবেন, খাবার মেন্যুতে অতিরিক্ত প্রোটিন যেন না থাকে। দেহে প্রোটিনের তুলনায় ভিটামিন ‘সি’ও ক্যালসিয়ামের পরিমাণ কমে গেলে চুল ঝরতে শুরু করবে। তাই নিজের চাহিদামতো সুষম খাবারে অভ্যাস গড়ে তুলুন। শাকসবজি, মৌসুমি ফল চুলের জন্য খুব উপকারী। ভেজা চুল বেশি আঁচড়াবেন না। এতে চুলের গোড়া দূর্বল হয়ে দ্রুত ঝরে যাবে। শুকানো চুল চিরুনি দিয়ে (মোটা দাঁতের চিরুনি) হালকা করে বারবার আঁচড়ান। মাথার ওপর থেকে নিচের দিকে আঙুল দিয়ে হালকা করে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ মিনিট ম্যাসেজ করুন। এতে মাথার প্রতিটি চুলের গোড়ায় রক্ত সঞ্চালিত হবে। মাথার স্নায়ুগুলো সতেজ হয়ে চুলের বৃদ্ধি ও মসৃণতা বাড়িয়ে তুলবে সব সময় হাসিখুশি থাকুন।


 দুশ্চিন্তা ত্বক, চুল ও দেহের প্রতিটি অঙ্গের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তাই সর্বদা প্রফুল্ল থাকুন। পরিচ্ছন্নতা সত্ত্বেও বাতাসে উড়ে বেড়ানো রোগ-জীবাণু মাথার চুলের গোড়া, ত্বক ও পোশাকে রেগে যায়। তাই প্রতি মাসে অন্তত দুবার গোসলের পারিতে স্যাভলন বা ডেটল ব্যবহার করুন। নিয়মিত স্যাভলন ব্যবহার করবেন না। এতে ত্বকে ক্ষতিকর প্রভাব পড়বে।


নখ: তাহ-পায়ের সুন্দর-পরিষ্কার নখ সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। ক্ষুদ্র ও ক্ষতিকারক রোগ-জীবাণুর অন্যতম আশ্রয়স্থল নখ। তাই নেইলপলিশ দেওয়া থাকলে নখের ফাঁকে যেন ময়লা না জমে সেদিকে খেয়াল রাখুন। অনেকেরই নখ ভঙ্গুর হয়। নখের ঔজ্জ্বল্য বাড়ানোর জন্য এবং ভঙ্গুরতা কমানোর জন্য ক্যালসিয়াম, আয়েডিন, আয়রনসমৃদ্ধ খাবার খান। মানুষের দেহ বিশাল কারখানার মতো। এর একটি অঙ্গের সঙ্গে রয়েছে অন্য অঙ্গের যোগাযোগ। এ যোগাযোগকে সফল করার জন্য সব সময় হাসিখুশি ও দুশ্চিন্তামুক্ত থাকুন। সুষম খাবার খান, হাঁটার অভ্যাস গড়ে তুলুন। দেহের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো সঠিকভাবে কাজ না করলে তার ক্ষতিকরণ প্রভাব পড়বে আপনার চেহারায়। তাই নিজেকে আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলার জন্য প্রথম থেকেই সতর্ক হোন।

Comment As:

Comment (0)