নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলা

A+ A- No icon

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে শুধু আল নূর মসজিদ নয়, কাছাকাছি লিনউড মসজিদেও হামলা চালানো হয়। হামলায় নারী ও শিশুসহ এ পর্যন্ত ৪০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দুজন বাংলাদেশি। গুরুতর আহত ২০ জন। নিহত মানুষের সংখ্যা বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। নিউজিল্যান্ডের কোনো মসজিদে কোনো মুসলিমকে না যেতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ।

 

হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে এক নারীসহ চারজনকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া পুলিশ বেশ কয়েকটি আইইডিএস (ইমপ্রুভড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বিস্ফোরক স্থাপন করা একটি গাড়ি পেয়েছে। বিস্ফোরকগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।

 

ক্রাইস্টচার্চে স্থানীয় সময় দেড়টার দিকে মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায়রত মুসল্লিদের ওপর স্বয়ংক্রিয় বন্দুক নিয়ে হামলা চালায় এক হামলাকারী। হামলার ঘটনাটি ফেসবুকে লাইভও করেন অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী ওই শ্বেতাঙ্গ হামলাকারী। ভিডিওটি অনলাইনে না ছড়াতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ। ইতিমধ্যে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছে পুলিশ।

অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম সুফিউর রহমান প্রথম আলোকে জানান, আল নুরসহ দুটি মসজিদে হামলার ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি রয়েছেন।

 

বিবিসি, রয়টার্স, এএফপি, নিউইয়র্ক টাইমস, নিউজিল্যান্ড হেরাল্ডসহ স্থানীয় বেশ কয়েকটি নিউজ পোর্টাল থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, চারপাশে তাঁরা শুধু মানুষের রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। এর মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। 

 

একজন প্রত্যক্ষদর্শী ফিলিস্তিনি জানান, তিনি একজনকে মাথায় গুলি করতে দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি পরপর দ্রুত তিনটি গুলির আওয়াজ পাই। ১০ সেকেন্ড পর আবার গুলি শুরু হয়। এটা অবশ্যই স্বয়ংক্রিয় বন্দুক হবে। তা না হলে কোনো মানুষের পক্ষে এত দ্রুত ট্রিগার টানা সম্ভব নয়। লোকজন দৌড়াতে শুরু করে। কারও কারও দেহ রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।’ তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে দৌড়ে পালিয়ে তিনি প্রাণে রক্ষা পান।

 

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা অ্যারডার্ন এ ঘটনার নিন্দা প্রকাশ করে বলেছেন, কত সংখ্যক হতাহত, সে তথ্য এখনো নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি। এখনো তথ্য আসছে। এ ঘটনা নিউজিল্যান্ডের জন্য ঘোর অমানিশা বলে মন্তব্য করেন তিনি। 


প্রথম হামলাটি চালানো হয় মধ্য ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে। মসজিদ দিয়ে মুসল্লি দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল। দ্বিতীয় হামলাটি চালানো হয় কাছাকাছি লিনউড শহরতলির এক মসজিদে।
নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে জানানো হয়, আল নূর মসজিদে ৩০ জন ও লিনউড মসজিদে ১০ জন নিহত হন। গুরুতর আহত ২০ জন।

 

স্টাফ ডট কো ডট এনজেড নামের নিউজিল্যান্ডের একটি নিউজ পোর্টালে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, নামাজ আদায়রত অবস্থায় তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান। তিনি দৌড়ে মসজিদ থেকে পালিয়ে এসে দেখে তাঁর স্ত্রী ফুপাতে পড়ে আছেন। মৃত।


আরেকজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, তিনি শিশুদের গুলিবিদ্ধ হতে দেখেছেন। তিনি বলেন, চারপাশে শুধু লাশ আর লাশ।

 

রেডিও নিউজিল্যান্ডকে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, গুলির শব্দ শোনার পর তিনি দেখেন—চারজন মেঝেতে পড়ে আছেন। চারদিক রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। 

 

পুলিশ জানায়, কোনো বাসিন্দাকে বাড়ি থেকে এবং স্কুল থেকে বের না হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নিউজিল্যান্ডের কোথাও মুসলিমদের না যেতে নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ।

 

আজ মসজিদের কাছাকাছি জলবায়ু বিষয়ক সচেতনতামূলক সমাবেশে শিশুদের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। হামলার পর পর ওই সমাবেশ বাতিল করা হয়। ওই শিশুদের বাড়ি ফিরিয়ে নিতে বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের না হতে অনুরোধ জানিয়েছে ক্রাইস্টচার্চ সিটি কাউন্সিল। তারা জানিয়েছে, বাবা-মায়ের জন্য শিশুদের সন্ধান পেতে তারা হেল্পলাইন চালু করেছে। পুলিশ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত যেন তারা সন্তানদের খোঁজে না বের হন।

 

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে নিরাপদে চলে আসতে পেরেছেন। ক্রিকেট দলের মুখপাত্র জানিয়েছেন, ক্রিকেট দলের কয়েকজন সদস্য মসজিদে যাওয়ার জন্য বাস থেকে নেমে গিয়েছিলেন এবং তাঁরা ঠিক ওই সময়ে মসজিদে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, সদস্যরা নিরাপদে আছেন। তবে তাঁরা মানসিকভাবে ধাক্কা খেয়েছেন। দলের সদস্যদের হোটেল থেকে বের না হতে বলা হয়েছে।

 

নিউজিল্যান্ডে এভাবে বন্দুক হামলার ঘটনা বিরল। ১৯৯০ সালে সাউথ আইল্যান্ডের আরামোয়ানা শহরে মানসিকভাবে অসুস্থ এক ব্যক্তি গুলি করে ১৩ জনকে হত্যার পর দেশটির অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ আইন কড়া করা হয়। ১৯৯২ সালে আধা স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের ব্যাপারে দেশটির আইনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এরপরও ১৬ বছরের বেশি বয়সী কেউ নিরাপত্তা কোর্স সম্পন্ন করার পর নির্ধারিত মানের অস্ত্র নিবন্ধনের সুযোগ পান। 

 

এই হামলার আগে আরেকবারও বিশ্ব শিরোনামে উঠে এসেছিল নিউজিল্যান্ডের দক্ষিণের শহর ক্রাইস্টচার্চের নাম। ছোট্ট এই শহরটিতে ২০১১ সালে আঘাত এনেছিল ভূমিকম্প। ওই সময় বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। শহরের ঐতিহ্যবাহী ক্যাথেড্রাল (গির্জা) ভূমিকম্পে ধসে পড়ে।

Comment As:

Comment (0)