অতি পুরাতন কথা নব আবিষ্কার

A+ A- No icon

জাতীয় সংসদের অধিবেশন আবার শুরু হয়েছে গত বুধবার। সংসদীয় গণতন্ত্রের বিকল্প কিছু আপাতত কেউ ভাবছেন না। সংসদীয় ব্যবস্থায় জাতীয় সংসদই হলো প্রাণ। এটিই হবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সব ইস্যুতে আলোচনা-সমালোচনা এবং বিতর্কের কেন্দ্র—এ নিয়ে সমাজে দ্বিমত নেই। পরিপূর্ণ মানবদেহে যেমন দুটি চোখ থাকে, সাংসদদেরও তা-ই থাকার কথা, যদি সবকিছু স্বাভাবিক গতিতে চলে। এই দুটি চোখ হলো সরকারি দল এবং বিরোধী দল। দুটি চোখ দিয়ে সমাজের পুরো ছবিটা দেখা যায়। একটি চোখ না থাকলে ব্যবস্থাটি হোঁচট খায়, কার্যকর হয় না।


আমাদের জাতীয় সংসদে বিরোধী দল আছে, আবার বিরোধী দল নেই। ২০১৪ সাল থেকেই এ অবস্থা চলে আসছে। কেউ কেউ বলেন, ভালোই তো। ঝগড়াঝাঁটি নেই, একে অন্যকে গাল দেয় না, শূন্যে ফাইল ছুড়ে মারে না। যখন-তখন ওয়াকআউট নেই। অর্থাৎ, আমাদের রাজনীতির যে অভ্যাসটি দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, সেখান থেকে তো মুক্তি পাওয়া গেল। তবে ঝগড়া বা গালমন্দ যে একেবারে থেমে গেছে, তা বলা যাবে না। সরকারি দলের সাংসদদের লক্ষ্য এখনো বিএনপি। দলটি এবং তার শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে তাঁরা অনবরত বলে যাচ্ছেন, বিএনপি সংসদে না থেকেও আছে। এটিকে বলা যায় ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ। বিএনপি থেকে যে ছয়জন সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন বা যে ছয়জনকে জিততে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের মধ্যে একজন ইতিমধ্যেই শপথ নিয়েছেন। তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও আরও কয়েকজন লাইনে আছেন বলে শোনা যাচ্ছে। সব হিসাব-নিকাশ ও পূর্বাভাস মিথ্যা প্রমাণ করে তাঁরা যদি সংসদে গিয়ে হাজির হন, তাহলেও দলটির অবস্থার হেরফের হবে না। বরং সংসদে না গিয়েও তাঁরা ‘প্রকৃত বিরোধী দলের’ যে ‘মর্যাদা’ পাচ্ছেন, সংসদে গেলে হয়তো সেটাও হারাবেন। রাজনীতিবিদেরাই তো আকছার বলে থাকেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই।


গত ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে আওয়ামী ও বিএনপি উভয় বৃত্তের অনেককেই দেখা গেছে পল্টি খেয়ে বিগত দিনের শত্রুকে আঁকড়ে ধরতে। তবে এটি কোনো নতুন ঘটনা নয়। অতীতেও এমনটি ঘটেছে বারবার। বাঙালি রাজনীতি অন্তঃপ্রাণ। রাজনীতি ছাড়া বাঙালির চলে না। পেটে ভাত না থাকলেও রাজনীতি ছাড়ে না। বাঙালির জীবন রাজনীতিময়। একটু এদিক-সেদিক হলেই চারদিকে শোরগোল ওঠে। ‘বিরাজনীতিকরণ’ হচ্ছে বলে মাতম শোনা যায়। এখন তো রাজনীতির রীতিমতো কৃষ্ণপক্ষ চলছে। ফুটবল খেলায় প্রতিপক্ষ না থাকলে ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে সুখ পাওয়া যায় না। এখন অবস্থা অনেকটা সে রকম। যে রাজনীতি বাঙালির দৈনন্দিন জীবনযাত্রার অংশ, সেটিই যেন হারিয়ে যেতে বসেছে।


জনজীবনে সমস্যার অন্ত নেই। বেশির ভাগ সমস্যা হলো রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার। খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায়, নানান সমস্যা নিয়ে সংবাদ শিরোনাম। অন্তহীন জনভোগান্তি। তো, এসবের প্রতিকার হবে কীভাবে? মানুষ আশা করে, তাদের হয়ে রাজনীতিবিদেরা এসব কথা বলবেন, সরকার ও রাষ্ট্রকে জবাবদিহির আওতায় আনার চেষ্টা করবেন। কিন্তু রাজনীতিবিদেরা জনদুর্ভোগ নিয়ে তেমন সোচ্চার নন। সরকার কিংবা বিরোধী দল, সবাই যেন ছায়ার সঙ্গেই যুদ্ধ করে চলেছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কহীন বায়বীয় সব কথাবার্তা বলে দায়িত্ব সারছেন। সরকারি দলের লোকদের কথা শুনলে মনে হয়, দেশে তেমন কোনো সমস্যা নেই। দেশ উন্নয়নের মহাসড়কে দ্রুতগতিতে চলছে, আমরা বিশ্বের রোল মডেল হয়ে গেছি। এ নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন তাঁরা। বিরোধী দলের কথা শুনলে মনে হয়, তাদের সরকারে বসিয়ে দিলেই মুশকিল আসান হবে। তারা কখনোই তাদের অতীতের স্কোর কার্ড খুলে দেখে না। এখানে কেবল দল নয়, রাজনীতি যেন জবাবদিহির বাইরে চলে গেছে।


এ রকম একটি প্রতিকূল অবস্থায় নাগরিকদের প্রতিবাদের ভাষা বদলে যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের ওপর ভরসা কমে যাওয়ায় তাঁরা নিজেরাই নিজেদের শক্তিতে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি জনবিক্ষোভে এর প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশেষ করে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার কিংবা নিরাপদ সড়কের দাবিতে ছাত্ররা দলে দলে বেরিয়ে এসেছে। রাজনীতির বাইরে নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে যূথবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রতিবাদের এই ভাষার প্রবল উপস্থিতি আমরা প্রথমে দেখেছি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শাহবাগের জমায়েতে। তবে আশঙ্কার কথা হলো, এ ধরনের বিক্ষোভ-আন্দোলনে রাজনৈতিক লাভালাভের জন্য দলগুলোর মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এসব আন্দোলনের সমর্থন বা বিরোধিতার মধ্য দিয়েই তারা তাদের রাজনীতির স্বরূপটি তুলে ধরে। নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানানোর একটা বড় মাধ্যম হলো সড়কের পাশে মানববন্ধন। বুকের কাছে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়া। যার যা কথা, সে তো প্ল্যাকার্ডেই লেখা আছে। শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনের সড়কটি তো এখন রীতিমতো ‘মানববন্ধন চত্বর’। প্রশ্ন হলো, এ ধরনের প্রতিবাদের ভাষা কর্তৃপক্ষ বোঝে কি না, কিংবা আমলে নেয় কি না।


কয়েক দিন হলো ঢাকার সাতটি কলেজের শিক্ষার্থীরা তাঁদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক আচরণের প্রতিবাদে পথে নেমে এসেছেন। অভিযোগের তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে। সাতটি কলেজকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতামুক্ত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসার সময়ও টানাপোড়েন লক্ষ করা গিয়েছিল। তখন গুঞ্জন ছিল, দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের দ্বন্দ্বের বলি এই সাত কলেজের লাখের বেশি শিক্ষার্থী। মনে হয় সমস্যাটি এখনো রয়ে গেছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সক্ষমতা দিন দিন বাড়ছে না কমছে, সেটিই একটি প্রশ্ন। গত কয়েক দিন গণমাধ্যম তোলপাড় ছিল ওয়াসা নিয়ে। সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিআইবির একটি প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ টেনে বলে দিলেন, ওয়াসার পানি সুপেয়। তবে তিনি এটি সরাসরি পান করেন না, ফুটিয়ে পান করেন বা বোতলজাত পানি পান করেন। এ নিয়ে এক অভিনব প্রতিবাদের আয়োজন করেছিল ঢাকার জুরাইনের মিজানুর রহমানের পরিবার। তারা ওয়াসার কলের পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে ওয়াসা অফিসে নিয়ে এসেছিল এমডি সাহেবকে আপ্যায়ন করার জন্য। এমডি সাহেব আর অফিসমুখো হননি। কিন্তু বিষয়টি নাগরিক মনকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে এবং আমাদের সমাজে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির জায়গাটির দিকে বিরাট একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন ছুড়ে দিয়েছে।


২০০৮ সালে নির্বাচনে জিতে ১৪-দলীয় জোট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পর মানুষ আশায় বুক বেঁধেছিল। ভেবেছিল, জনজীবনে স্বস্তি আসবে। আসেনি। সব জায়গায় দুর্বৃত্তায়নের ছোবল দেখা গেছে। ওই সময় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান একটি মন্তব্য করেছিলেন—দেশ এখন বাজিকরদের হাতে। তিনি কোনো দল বা কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু ‘ঠাকুর ঘরে কে রে’, যেন এই সংকেত পেয়ে জনৈক মন্ত্রী গায়ে পড়ে বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে লক্ষ্য করে অসৌজন্যমূলক কথা বলেছিলেন। কয়েক দিন আগে জাতীয় সংসদের সদস্য রাশেদ খান মেনন ক্ষোভের সঙ্গে বলেছেন, দেশে এখন লুটেরাদের রাজত্ব। এ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বেশ ট্রল হচ্ছে। এত দিনে তাঁর এ উপলব্ধি হলো? এ যেন ‘অতি পুরাতন কথা নব আবিষ্কার।’

Comment As:

Comment (0)