মুসলমান ভোটারদের মন জয়ের প্রতিযোগিতা

A+ A- No icon

দেশভাগের পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গের মুসলমান সমাজ নিয়ে টানাপোড়েনের শেষ নেই। একদিকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতি, অন্যদিকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক রাজনীতি—এ দুইয়ের টানাপোড়েনে মুসলমান সমাজ বিপন্নতার মধ্যে বাস করতে বাধ্য হয়। নির্বাচনের সময় এ টানাপোড়েন চরমে ওঠে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি সমগ্র মুসলমান সমাজকেই বহিরাগত, অবৈধ অনুপ্রবেশকারী, মৌলবাদী, এমনকি সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর বলে। সে তুলনায় উদারবাদী ধর্মনিরপেক্ষ বাম দলগুলো ও কংগ্রেসের প্রতিবাদ তেমন জোরালো হয় না। আবার এসব দলের মধ্যেও যে হিন্দুত্ববাদী চিন্তা প্রচ্ছন্ন থেকে যায়, তা হাওয়া বুঝে সামনে চলে আসে।


সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি বেশির ভাগ ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দলই কিছুটা অভিভাবকসুলভ মনোভাব নিয়ে কিছু ‘পাইয়ে দিয়ে’ দায়িত্ব সারতে চায়; হিন্দু–মুসলমান সম্প্রীতি রক্ষার আশ্বাস দিয়ে ভোট চায়। পশ্চিমবঙ্গে মুসলমানরা জনসংখ্যার অন্তত ২৭ শতাংশ, ভোটের বাজারে তাদের গুরুত্ব আছে। লোকসভার অনেকগুলো আসনে ভোটের ফল নির্ধারণে তাদের প্রভাব আছে; বিধানসভার ক্ষেত্রে তা আরও বেশি। তাই মুসলমান সমাজের সমর্থন আদায়ের জন্য সারা বছর ধরেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একটা নিঃশব্দ প্রতিযোগিতা চলে। পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ মুসলমান বাঙালি; তাঁদের জীবিকা চাষাবাদ। আর অবাঙালি মুসলমানরা হিন্দি ও উর্দুভাষী উত্তর প্রদেশ ও বিহার থেকে আসা শ্রমিক, তাঁরা প্রধানত শিল্পাঞ্চলে বাস করেন। তাই বামপন্থীদের আমলে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে শিল্প করার বিরুদ্ধে তাঁরা আন্দোলনে শামিল হয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিলেন।


মমতা বুঝেছিলেন, অধিকাংশ মুসলমানের সমর্থন টানতে পারলে নির্বাচনে তৃণমূলের জয় নিশ্চিত। মুসলমান মাত্রই ধর্মীয় নেতাদের দ্বারা প্রভাবিত, এমন ধারণার বশবর্তী হয়ে মমতা ক্ষমতায় আসার আগ থেকেই মুসলমান ধর্মীয় নেতাদের কাছে টানতে শুরু করেন। যেমন, তিনি কলকাতার টিপু সুলতান মসজিদের প্রধান ইমাম (পরে বরখাস্ত) শাহি ইমাম নূর রেহমান বরকতি, হুগলি জেলার ফুরফুরা শরিফের পীরজাদা ত্বহা সিদ্দিকী প্রমুখকে কাছে টানেন। কলকাতায় প্রতিবছর ২১ জুলাই মমতার দল তৃণমূলের জনসভার মঞ্চেও দেখা যেতে লাগল বরকতিকে। এই সঙ্গে কংগ্রেস থেকে আসা ইদ্রিস আলী, জামায়েতে হিন্দ দলের নেতা সিদ্দিকুল্লা চৌধুরীকে সঙ্গে নিলেন—এ দুই নেতার বিরুদ্ধে ২০০৮ সালে তসলিমা নাসরিনকে রাজ্যছাড়া করার দাবিতে কলকাতায় দাঙ্গা বাধানোর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও। বর্তমানে সিদ্দিকুল্লা চৌধুরী মমতার মন্ত্রিসভার সদস্য, ইদ্রিস আলী বসিরহাট থেকে তৃণমূলের সাংসদ হয়েছিলেন।


অন্যদিকে ধর্মীয় নেতারাও যে তাঁদের সমর্থনের বিনিময়ে নিজেদের প্রাপ্য বুঝে নিতে দর–কষাকষি করতে কসুর করেননি, তা বরকতি নিজেই ফাঁস করেছেন। ২০১৮ সালে বরকতি সংবাদমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেন যে টাকাটাই তাঁর কাছে আসল, উপযুক্ত টাকা পেলে তিনি বিজেপির হয়েও কাজ করতে রাজি। ক্ষমতায় এসেই মমতাও রাজ্যের প্রায় ১২ হাজার ইমাম ও কয়েক হাজার মুয়াজ্জিনের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করেন। কলকাতা হাইকোর্ট এ সিদ্ধান্তকে বৈষম্যমূলক বলে বাতিল করলেও সরকার ওয়াক্ফ বোর্ডের মাধ্যমে ওই ভাতা বহাল রেখেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু যুব ফেডারেশনের নেতা কামরুজ্জামানের দাবি, মমতা সরকারও বামপন্থীদের মতোই মুসলমানদের অবস্থার উন্নতির ব্যাপারে উদাসীনই থেকে গেছে। মমতার আমলে রাজ্যে নতুন মাদ্রাসার জন্য সরকারি স্বীকৃতি মেলেনি। বাম আমলের শেষ সময়ে তাড়াহুড়ো করে অর্ডিন্যান্স জারি করে সরকারি চাকরিতে মুসলমানদের জন্য ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু তারপর ক্ষমতার পালাবদলের ডামাডোলে সেই অর্ডিন্যান্স আর আইনে পরিণত হয়নি। মমতাও এ নিয়ে কিছু করেননি।


কিন্তু ইমামভাতা চালু করার পর থেকেই পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুদের একাংশ মমতার ‘মুসলমানপ্রীতি’ নিয়ে কটাক্ষ শুরু করে। বিজেপি তাতে ইন্ধন জোগায়। হিন্দু–মুসলমান মেরুকরণের চেষ্টা বাড়ে। গত দুই বছরে বিজেপি রাজ্যজুড়ে রাম নবমীর দিন সশস্ত্র মিছিল বের করে। এই মেরুকরণের রাজনীতির জেরে বসিরহাট, উত্তর দিনাজপুরের কালিয়াচক, আসানসোল ও হাওনার ধূলাগড় এলাকায় বড়সড় দাঙ্গা হয়ে গেছে। বিজেপি মমতার ‘মুসলমানপ্রীতি’ নিয়ে প্রকাশ্যে আক্রমণ শুরু করায় মমতা নিজেকে ‘খাঁটি হিন্দু’ প্রমাণের চেষ্টায় জনসভায় জনসভায় চণ্ডী, গীতা প্রভৃতি হিন্দু শাস্ত্রগ্রন্থ থেকে শ্লোক আওড়াতে শুরু করেন, ২০১৮ সালে রাজ্যের ২৮ হাজার দুর্গাপূজা কমিটিকে সরকারি তহবিল থেকে ১০ হাজার টাকা করে দিতে শুরু করেন, উর্দুভাষীদের জন্য রাজ্যে উর্দু বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার ঘোষণা করেন, বিহারি জনসমাজের কথা ভেবে ছটপূজায় বিশেষ ছুটি ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেন।


এভাবে মমতা পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে তুষ্ট করার চেষ্টা চালান। তিনি মুসলমান ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তির ব্যবস্থাও করেন। কিন্তু মুসলমান সমাজের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থার বিশেষ পরিবর্তন করার সরকারি উদ্যোগ দেখা গেল না। কামরুজ্জামানের মতে, ২০০৬ সালে সাজার কমিশনের রিপোর্টে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের যে দুরবস্থার কথা বলা হয়েছিল, তার বিশেষ পরিবর্তন হয়নি। অন্যদিকে তাঁর মতে, মমতা এখন বিজেপির সঙ্গে হিন্দুত্বের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। নরেন্দ্র মোদি যদি উগ্রপন্থী হিন্দুত্বের মুখ হন, তাহলে মমতা অবশ্যই ‘নরমপন্থী’ হিন্দুত্বের মুখ।


এ অবস্থায় লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে লড়াই যেভাবে মোদি ও মমতার মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে, তাতে মুসলমান সমাজের সংকট আরও বেড়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসার্চের গবেষক মইদুল ইসলাম মনে করিয়ে দেন যে মুসলমান সমাজ একমাত্রিক ব্যাপার নয়, তাদের মধ্যে বহু স্তর, বহু ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। ভোটের সময়ও তাঁরা সবাই একভাবে ভোট দেন না। যেমন তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোথাও কংগ্রেসকে, কোথাও বাম দলকে, আর কোথাও তৃণমূল কংগ্রেসকে সমর্থন করেছেন। এবার অবশ্য বিজেপিও তাতে ভাগ বসাচ্ছে বলে ইঙ্গিত রয়েছে। মুর্শিদাবাদে বিজেপির লোকসভা নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন সাবেক সিপিএম বিধায়ক মাহফুজা খাতুন। বীরভূমের গ্রামে গ্রামে বেশ কিছুদিন ধরেই মুসলমানরা সিপিএম ছেড়ে বিজেপির হাত ধরছেন, এবার ভোটের সময় তা আরও বেড়েছে। তবু কামরুজ্জামান মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এবারের লোকসভা নির্বাচন মুসলমানদের অস্তিত্ব ও নিরাপত্তার লড়াই। তাই মোদিকে ঠেকাতে তাঁদের এককাট্টা হয়ে মমতার পাশে দাঁড়ানো ছাড়া অন্য উপায় নেই। পরে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের সময় না হয় মমতার সঙ্গে বোঝাপড়া করা যাবে।

Comment As:

Comment (0)