সর্বশেষ:
‘গান্ধী পরিবারের বাইরে কেউ সভাপতি হলে কংগ্রেস ভেঙে যাবে’ : নটবর সিং ইসরায়েলে ৯০০০ বছর আগের ‘রহস্যময়’ শহরের সন্ধান ব্লগার নয়, নতুন নায়িকার সঙ্গে প্রেম শাহরুখপুত্রের! সারা দেশে ত্রাণের জন্য বানভাসি মানুষের আহাজারি : রিজভী ঈদে ওয়ালটনের ‘এক্সচেঞ্জ অফার’

পুলিশ কেন জঙ্গিদের টার্গেটে?

A+A- No icon

বাংলাদেশে আইএস-এর অস্তিত্ব রয়েছে কিনা, বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ঊর্ধ্বতনরা বারবার বলে আসছেন, এর কোনও অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই। কিন্তু বিদেশি সংবাদ মাধ্যমগুলো থেকে শুরু করে জঙ্গিগোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত ওয়েবসাইটগুলো বরাবরই বাংলাদেশে আইএস রয়েছে বলে খবর দিয়ে যাচ্ছে। যদিও সে খবরের সত্যতা প্রমাণ কঠিন। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কায় ভয়াবহ জঙ্গি হামলার পর বাংলাদেশে ‘শিগগিরই আসছি’ বলে যে বার্তা দেওয়া হয়েছে, তাতে কিছুটা হলেও শঙ্কিত হতে হয় বৈকি! ২১ এপ্রিল এই হামলার পর ২৯ এপ্রিল ঢাকার গুলিস্তানে পুলিশ বক্সে হামলা চালানো হয়। আর ২৬ মে রাতে ঢাকার মালিবাগে পুলিশের গাড়িতে বিস্ফোরণ ঘটে। যেখানে শক্তিশালী একটি হাতবোমা আগে থেকেই রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ডিএমপি কমিশনার। এই দুটি হামলার ধরন কিন্তু একই এবং জঙ্গি সংগঠনগুলোর ওপর নজর রেখে খবর প্রকাশ করে থাকে এমন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স জানাচ্ছে, দু’টি হামলার দায় স্বীকার করেছে ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠী। প্রথমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সেটিকে উড়িয়ে দিলেও পরে খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছে।

 

দুটি প্রশ্ন উঠেছে। প্রথমত, জঙ্গিরা কেন বাংলাদেশের পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে হামলার টার্গেট হিসেবে নিয়েছে? দ্বিতীয়ত, কতটা সক্রিয় আইএস বা অন্য জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো?

 

নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর যে হামলা চালানো হবে, সেটি অবশ্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বার্তার মাধ্যমে জঙ্গিগোষ্ঠী জানান দিয়েছিল তাদের ওয়েব সাইট ও ভিডিও বার্তার মাধ্যমে। ২০১৭ সালে মার্চেই দুটি হামলা হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের বাইরে পুলিশের একটি চেক পোস্টের কাছে বোমা বিস্ফোরণে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছিলে। যে নিহত হয়েছে, সে নিজেই বোমা বহন করছিল বলে এটিকে আত্মঘাতী হামলাও বলা হয়েছে। একই মাসে র‌্যাবের অস্থায়ী সদর দফতরের নির্মাণকাজ চলার সময় এক যুবক তার সঙ্গে বহন করা বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। আইএস পরিচালিত একটি ওয়েবসাইট ‘আমাক’ থেকে এসব হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছিল। বেছে বেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর হামলার কারণ হচ্ছে, আমাদের দেশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি এদের ওপর সাধারণত নেতিবাচক। এই বিষয়টি কাজে লাগাতে পারে জঙ্গিগোষ্ঠী। আবার হামলার জন্য এদের পাওয়া সহজ। জঙ্গিদের প্রথম যে কাজটি, সেটি হলো জনমনে ভীতি, আতঙ্ক তৈরি করা। এছাড়া তারা আলোচনায় আসতে চায়, সে কারণে এমন ব্যক্তি বা স্থান টার্গেট করে থাকে, যা তাদের প্রচারের আলোয় নিয়ে আসবে। আরও একটি চ্যালেঞ্জ তাদের মধ্যে কাজ করে, যেহেতু জঙ্গি দমনে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যথেষ্ট সক্রিয়, সে কারণে তাদের প্রতি ক্ষোভটাও বেশি।   

 

দেশে গেলো কয়েক বছরে বেশ কঠোর হাতে জঙ্গি দমন করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী। বিশেষ করে হোলি আর্টিজানের হামলার পর। কিন্তু এরপরও লেখক, প্রকাশক, ব্লগার ও ভিন্ন চিন্তার মানুষের ওপর জঙ্গিদের পরিকল্পিত হামলা ও হত্যা বন্ধ হয়নি। শুধু সংগঠনগুলোর নাম পাল্টেছে মাত্র। কাজেই জঙ্গিরা যে নামেই থাকুক না কেন, তাদের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য কিন্তু অভিন্ন। চলতি বছরের শুরুর দিকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস তাদের একটি সাময়িকীতে বাংলাদেশে খলিফা নিয়োগের দাবি করেছিল। পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম তখন সংবাদ মাধ্যমে বলেছিলেন, তার জানা মতে বাংলাদেশে আইএস কোনও খলিফা নিয়োগ করেনি। খলিফা নিয়োগই বড় কথা নয়। সম্প্রতি পুরো বিশ্বের জন্য জঙ্গিগোষ্ঠী যে হুমকি হয়ে উঠেছে, তার প্রভাব বাংলাদেশে পড়বে, সেটাই স্বাভাবিক। এমনিতে গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশে এখন জেঁকে বসেছে। সেখানে পালে হাওয়া লাগাতে পারে জঙ্গিবাদীরা। সিরিয়া ও ইরাকে আইএস খিলাফত প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার পর বিশ্বের অনেক দেশ থেকে নাগরিকরা তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। সেই তালিকায় কিন্তু বাংলাদেশের লোকজনও রয়েছে। এছাড়া রয়েছে বিদেশে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতও। এখন খিলাফত মার খাওয়ার পর অনেকে ফিরছে। পুলিশ বলছে বিমানবন্দরে সতর্ক রয়েছে, যেন কেউ দেশে ফিরতে না পারে। কিন্তু পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়েও যে কেউ ফিরতে পারে, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে ফেব্রুয়ারিতে সিরিয়া ফেরত এক জঙ্গিকে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট আটক করার পর। কিন্তু ওই ব্যক্তি বাংলাদেশে প্রবেশ করে আরও তিনমাস আগে।

 

সিরিয়া বা ইরাক থেকে জঙ্গিরা দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে বলে খবর রয়েছে। বাংলাদেশেও তারা হয়তো সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করবে বা করছে। সেটা যে নামেই হোক না কেন। একইসঙ্গে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, বাংলাদেশি পাসপোর্ট হলে না হয় গ্রেফতারে সুবিধা, কিন্তু বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত অন্য দেশের নাগরিক হলে তাদের গ্রেফতার কঠিন বৈকি! জঙ্গিরা সারাবিশ্বে তাদের প্রচার ও প্রসার ঘটাতে চায়। আমাদের দেশে জঙ্গি নিয়ন্ত্রণ করা গেছে, এটা সত্য। কিন্তু পুরোপুরিভাবে যে নির্মূল করা যায়নি, সেটাও সত্য। যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও স্বীকার করে নিয়েছে। তার মানে এটা মানতেই হবে শুধু পুলিশি অভিযান দিয়ে জঙ্গিবাদ দমন সম্ভব নয়। এরসঙ্গে জড়িত সামাজিক ও আর্থিক অবস্থাও। কেন মানুষ জঙ্গিবাদে জড়াচ্ছে? আমাদের বেড়ে ওঠা, শিক্ষা ব্যবস্থা বা রাষ্ট্রের যে গঠন, তাতে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কিনা, তা খুঁজে বের করতে হবে।

 

একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে হবে, যেটিতে সবাই সম্পৃক্ত থাকবে। খুব সহজেই এই সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে হয় না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা। মাঝে মাঝে কিছু উদ্যোগ যে চোখে পড়ে না তা নয়। যেমন, ইমামদের মাধ্যমে মসজিদে খুতবা। স্কুলে, মাদ্রাসায় বা পাড়া মহল্লায় জঙ্গিবাদবিরোধী আলোচনা কিছুটা সুফল আনতে পারে। তবে সবকিছুর শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই। সামাজিক বন্দন দৃঢ় করার পাশাপাশি সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে পরিবারের পরস্পরের প্রতি। উগ্রতা, সাম্প্রদায়িকতাও একসময় জঙ্গিবাদের জন্ম দিতে পারে। আবার উচ্চ বিলাসিতা বা হতাশা থেকেও জন্ম হতে পারে জঙ্গিবাদের। সবকিছুই যে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তা নয়। সচেতন হতে হবে জনগণকেও। নইলে আইএস হোক জেএমবি হোক বা আনসারউল্লাহ বাংলা টিম যে নামেই ঢাকা হোক কীই-বা আসে যায়। কাজ কিন্তু একই। সভ্যতার ধ্বংস। সৃষ্টির বিনষ্ট বা অগ্রযাত্রা রুখে দেওয়া। যার সহজ টার্গেট হতে পারে তৃতীয় বিশ্বের এই উন্নয়নশীল বাংলাদেশ।

Comment As:

Comment (0)