আমলাদের অধিকারের সীমা

A+ A- No icon

সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় সরকারি কর্মকর্তা বা আমলারা সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছেন। পাস্তুরিত দুধে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতির কথা জানিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের গবেষকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়ে সমালোচিত হয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন। এরপর জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম হাত থেকে পানিতে পড়ে যাওয়া মোবাইল ফোন উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিসের ৬ সদস্যের ডুবুরি দলকে ব্যবহার করে সংবাদ শিরোনাম হন। সর্বশেষ মাদারীপুরের কাঁঠালিয়া ঘাটে যুগ্মসচিব আবদুস সবুর মণ্ডল নদী পার হবেন বলে তিন ঘণ্টা ফেরি আটকে রাখার ঘটনায় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা কিশোরের মৃত্যুতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষমতা ও অধিকারের সীমা নিয়ে। আমাদের দেশের সরকারি কর্মকর্তারা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাত্রাতিরিক্ত ক্ষমতা ভোগ করেন, অনেকে ক্ষমতার দাপটও দেখান। তারা সব সময় চান আলাদা গুরুত্ব, আলাদা মর্যাদা, বাড়তি সুযোগসুবিধা। এই বাড়তি মর্যাদা ও সুযোগসুবিধা ভোগ করতে গিয়ে তাদের অনেকেই সাধারণ মানুষকে বিড়ম্বনায় ফেলেন। অথচ তাদের সেটা করার কথা নয়। জনসেবা, জনকল্যাণ, জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করাই যাদের একমাত্র কাজ হওয়ার কথা। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বা রাষ্ট্রের এসব স্থায়ী কর্মচারীদের ইংরেজিতে বলা হয় পাবলিক সার্ভেন্ট বা জনগণের চাকর। তাদের একমাত্র কাজ জনগণের সেবা করা। কারণ তাদের বেতন-ভাতা হয় সাধারণ মানুষের ট্যাক্সের টাকায়।

 

উল্লেখ্য, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নীতি নির্ধারণ করেন রাজনৈতিক নেতারা। আর সেই নীতি বাস্তবায়ন করেন প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। এদের আমলা বলা হয়। ‘আমলা’ আরবি শব্দ। এর অর্থ আদেশ পালন ও বাস্তবায়ন। শব্দগতভাবে তাই যে সকল সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সরকারের আদেশ পালন ও বাস্তবায়ন করে তাদেরকে আমলা বলে। এই আমলাদের সংগঠন বা আমলা-সমাজের নাম বুরোক্রেসি বা আমলাতন্ত্র। জার্মান সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্সওয়েবার সর্বপ্রথম আমলাতন্ত্রকে একটি আইনগত ও যুক্তিসংগত মডেল হিসেবে উপস্থাপন করেন। তার তত্ত্ব অনুযায়ী, আধুনিক ধনতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র প্রশিক্ষিত প্রশাসক এবং কর্মীদের একটি সংগঠন হিসাবে চিহ্নিত। যার মাধ্যমে যুক্তিবাদী আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। এই আধিপত্য গড়ে ওঠে কর্তৃত্বের উপর নির্ভর করে।

তবে আমরা অভিধানে বর্ণিত কিংবা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সংজ্ঞার আলোকে উপস্থাপিত ‘আদর্শ আমলা’র সন্ধান বড় বেশি পাই না। আমরা সাধারণ অভিজ্ঞতায় দেখি আমলা হচ্ছে সরকারি চাকরি করা বড় বড় পদবিধারী ক্ষমতাধর মানুষ। যাদের কাছে সাধারণ মানুষ সহজে যেতে পারে না। তাদের স্যার, মহোদয় ইত্যাদি সম্মানসূচক বিশেষণ যোগ করে অত্যন্ত আদবের সঙ্গে সম্বোধন করতে হয়। তারা সব সময় একটা অদৃশ্য প্রাচীর রচনা করে চলেন। যেখানে সাধারণের প্রবেশাধিকার নেই। ফলে মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে আমলারা সবসময়ই একটা নেতিবাচক ভাবমূর্তির চরিত্র। যাদের মানুষ সমীহ করে, কিন্তু বড় বেশি ভালোবাসে না! আমাদের দেশে কিছু কিছু রাজনৈতিক নেতার মতো এই আমলাদের অনেকের মধ্যেও ‘গণশত্রু’ হয়ে ওঠার একটা প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে! এটা রাষ্ট্র সমাজ, সরকার কারও জন্যই শুভ নয়। আমলাদের জন্যও নয়। আমলাদের নিজের দিকে তাকানোর সময় এসেছে। নিজেদের ‘আচরণ’ বদলানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। আমলাদের সম্পর্কে দার্শনিক কার্ল মার্ক্স বলেছিলেন, ‘নিজেদের নাককেই তাঁরা কর্তব্যের অস্ত্র মনে করেন এবং সব ব্যাপারেই সেইসব অস্ত্রের প্রয়োগ ঘটান। এই নাক গলানোর কর্মকাণ্ডই তাঁদের কাছে জাতীয় স্বার্থ এবং নিয়মের অর্থ’। তিনি আরও বলেছিলেন, আমলারা সম্পূর্ণভাবে কর্তৃত্বের পূজারি। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো ব্যবহার করে এই আমলাসমাজ। লেনিনও আমলাদের সম্পর্কে একই রকম নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন।

 

আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দুর্বলতার সুযোগে আমলাতন্ত্র তার নখদন্ত প্রবলভাবে প্রকাশ করতে শুরু করে। আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্য দেখে অনেকে একে ‘আমলাশাহীও বলে থাকেন। মিশেলসের তত্ত্ব অনুযায়ী দুর্বল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র তখন গোষ্ঠীতন্ত্রে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বকে কুক্ষিগত করে তোলে। আমাদের দেশে আমলাদের তেমন রূপই আমরা বার বার দেখি। তাই তো অনেকে আক্ষেপ করে বলেন, ‘দেশ তো মন্ত্রীরা চালান না, আমলারা চালান’।

হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর বঙ্গীয় শব্দকোষে আমলা শব্দের অর্থ বিবেচনা করতে গিয়ে অন্যতম সংজ্ঞা হিসাবে বলছেন: ‘উচ্চ কর্মচারীর অধীন কর্মচারী…’, অর্থাৎ আমলা শব্দের মধ্যেই অধীনতার ঘোষণা আছে। আসলে উপমহাদেশে ‘আমলা’ শব্দটির জন্ম-ইতিহাস রাষ্ট্রকর্মের আধুনিক ইতিবৃত্তে নয়, এর জন্ম ও লালন হয়েছে জমিদারি সেরেস্তায়। অন্তত আমাদের সংস্কারে নায়েব-গোমস্তা-সেরেস্তাভৃত্যদের একটা ছবি ফুটে ওঠে আমলা শব্দটায়। হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘শব্দকোষ’-এ আমলা শব্দটির নীচেই আছে আরেকটি শব্দ আমলাফয়লা। তার অন্যতম অর্থ মোসাহেব। রবীন্দ্রনাথেও আমলাফয়লাকে দেখা যায় মফঃস্বলি কাছারিতে। ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসে কর্তাদের শুভ কাজে ভৃত্যসমাজে উৎসাহের ঢেউ উঠল: ‘আমলা ফয়লা পাইক বরকন্দাজ সবারই গায়ে চড়ল নতুন লাল বনাতের চাদর, রঙিন ধুতি।’ শরৎচন্দ্র আরও স্পষ্ট। ‘দত্তা’য় বিজয়ার ‘দাস-দাসী-আমলা-কর্মচারী’দের উপর নরেন তার স্বত্বের কথা বলে, অন্য দিকে ক্ষুব্ধ বিলাসেরও নায়িকার কাছে ক্ষুণ্ণ প্রশ্ন: ‘আমি চাকর? আমি তোমার আমলা?’ বাংলা সাহিত্যে আমলা মানেই কর্তার বশংবদ ভৃত্য মাত্র।’’

 

স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ‘শেষের কবিতায় বললেন, ‘যারা সাহিত্যের ওমরাও-দলের, যারা নিজের মন রেখে চলে, স্টাইল তাদেরই। আর যারা আমলা দলের, দশের মন রাখা যাদের ব্যবসা, ফ্যাশান তাদেরই’। তবে তত্ত্বীয় এসব সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য ছাড়িয়ে আমাদের দেশে বেশিরভাগ আমলা এখন ‘নব্য জমিদারের’ ভূমিকায় অবতীর্ণ। তারা নিজেরাই নিজেদের নামে নানা ধরনের ‘মহত্ত্বের ছায়া’ আরোপ করে থাকেন। আমলাদের কাছ থেকে মানুষ ‘নিরপেক্ষতার নৈতিকতা’ আশা করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা ঘটে না। তারা শাসক দলের ‘চামচা’ অথবা নিজেরাই ক্ষমতাবান ‘অত্যাচারী’ হিসেবে আবির্ভূত হন। আমাদের দেশের রাজনীতিকদের মধ্যে অতীতের ধারাবাহিকতায় জনগণের উপর না হয়ে সামরিক, বেসামরিক, আমলাতন্ত্রের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। আমাদের দেশে এখন সরকারের টিকে থাকার পেছনে জনগণ নয় আমলাদের ভূমিকাই প্রধান। তাই সর্বত্র আমলাতন্ত্রের জয়-জয়কার। এটা দুঃখজনক। সরকারকে আমলাতন্ত্র বা আমলাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমলাদেরও নিজেদের ভূমিকা নিয়ে পর্যালোচনার সুযোগ আছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, সমাজে নিজেদের ‘ব্রাক্ষ্মণ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা, যুক্তির জোরের পরিবর্তে ‘জোরের যুক্তি’ প্রতিষ্ঠা করা–এগুলো আখেরে কোনো ভালো ফল বয়ে আনে না। এতে জনরোষ সৃষ্টি হতে পারে। এটা রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যের জন্য মোটেও ভালো নয়। এমনকি আমলাদের নিজস্ব স্বাস্থ্যের জন্যও তা ভালো নয়। কাজেই কোথাও যেন কোনো রকম বাড়াবাড়ি না হয়, তারা নিজেরা নিজেদের স্বর্গের দেবতা মনে করে ফুল-চন্দনচর্চিত আসনে অধিষ্ঠিত না করেন, সে ব্যাপারে সতর্ক হওয়া জরুরি।

Comment As:

Comment (0)