পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কেন এই অস্থিরতা?

A+ A- No icon

দেশের বেশ কটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা চলছে। ছাত্র বিক্ষোভ ও আন্দোলনের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার শান্তিপূর্ণ যে পরিবেশ ফিরে এসেছে তা ব্যাহত হওয়ার একটি আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। আমরা ঘরপোড়া গরু, আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখলেও বুক দুরুদুরু করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উপাচার্যদের বিরুদ্ধে ছাত্র-অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো উপাচার্যের অনৈতিক কার্যকলাপ অথবা দুর্নীতি-অনিয়মের খবর প্রকাশ হওয়ার পরই শিক্ষার্থীরা আন্দোলন শুরু করছেন। উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করছেন। ছাত্র বিক্ষোভের কারণে অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। বরিশাল ও গোপালগঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের বিদায় নিতে হয়েছে। নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রকে ছাত্রলীগের দুর্বৃত্তরা পিটিয়ে হত্যা করার পর সেখানে দোষীদের শাস্তির দাবিতে যে আন্দোলন শুরু হয়, তার রেশ এখনো চলছে। বুয়েটে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আবরার হত্যার সঙ্গে জড়িত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু তাদের বুয়েট থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন অব্যাহত আছে। শিক্ষার্থীরা বুয়েটের উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেছেন। উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও আছে। উপাচার্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালনে যোগ্যতা ও দক্ষতার পরিচয় দিতে পারেননি বলে অভিযোগ উঠছে। তিনি দায়িত্ব পালন করার সময় আবরার হত্যার মতো একটি মর্মান্তিক ঘটনা বুয়েটে ঘটল। ছাত্রলীগকে তিনি নিয়ন্ত্রণও করতে পারেননি। দিনের পর দিন ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের যে নানাভাবে নিগৃহীত হতে হয়েছে তা দমন করতেও ব্যর্থ হয়েছেন উপাচার্য। আবরার হত্যার পর ভিসির উচিত ছিল স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা। তিনি সেটা না করে পদ আঁকড়ে আছেন। অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা হলো, কোনো উপাচার্যই পদের মর্যাদা রক্ষার ব্যাপারে আন্তরিক বলে মনে হচ্ছে না।


আন্দোলন চলছে পাবনা বিশ্ববিদ্যালয়েও। সেখানেও উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করা হয়েছে। আন্দোলনের মাধ্যমে একটি অচলাবস্থা তৈরি না হলে সরকারের টনক নড়ছে না। ছাত্ররা যাকে উপাচার্য হিসেবে চায় না, যার বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ক্যাম্পাসে মিছিল-মিটিং-স্লোগান হয়, তিনি কোন মুখে ভিসির পদ আঁকড়ে থাকেন? শিক্ষকদের কি আত্মমর্যাদাবোধ বলে কিছু থাকতে নেই? একজন শিক্ষকের কাছে একটি প্রশাসনিক পদ যখন বড়ো হয়ে ওঠে, তখন তাকে আসলে বিবেকবোধবর্জিত হতেই হয়। শিক্ষকতা যে একটি মহত্ পেশা, সেটা এখন উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের পদাধিকারীরা ভুলে বসে আছেন। পদ পাওয়ার জন্য তারা যেমন রাজনৈতিক তদবিরের আশ্রয় নেন, পদ রক্ষা করার জন্যও তারা একইভাবে রাজনীতি করেন। দলীয় ক্যাডারদের ব্যবহার করেন। দলীয় আনুগত্য বিবেচনা করে, যোগ্যতা, অভিজ্ঞতার বিষয়গুলো বিবেচনায় না নিয়ে উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের বড়ো পদগুলোতে নিয়োগ দেওয়ার কারণে সমস্যা ঘনীভূত হচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এখন শিক্ষার গুণমান নিয়ে কেউ সেভাবে মাথা ঘামায় না। বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় আমাদের দেশের কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম না থাকায় কারো মধ্যে কোনো গ্লানিবোধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান তথা মুক্তবুদ্ধি চর্চার পাদপীঠ হওয়ার কথা থাকলেও সেখানে এখন ক্ষমতাসীনদের পক্ষ ভারী করার নির্লজ্জ প্রতিযোগিতা চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্যকেই যদি মুখ্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা অব্যাহত থাকলে আমাদের রসাতলযাত্রা কেউ রোধ করতে পারবে না।


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে গত প্রায় আড়াই মাস ধরে উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। উপাচার্য ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ছাত্রলীগকে বড়ো অঙ্কের আর্থিক সুবিধা দিয়েছেন। এই অভিযোগ একেবারে অসত্য হলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককে স্ব স্ব পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত না। উন্নয়ন প্রকল্প থেকে অর্থ ভাগবাঁটোয়ারার খবর যখন জানাজানি হয়, তখনই উপাচার্যের ব্যাপারেও একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ জরুরি ছিল। ছাত্রলীগকে চাঁদা দিয়ে তার নৈতিক স্খলন ঘটেছে। দুর্নীতির সঙ্গে হাত মেলানোর তথ্য জেনেও তাকে স্বপদে বহাল রাখার কোনো যুক্তি ছিল না। তিনি যদি নির্দোষ হয়ে থাকেন, তাহলে সেটাও উপযুক্ত তদন্তের মধ্য দিয়েই জাতিকে জানানো দরকার ছিল। তিনি দায়মুক্তি পেলে ছাত্রলীগের নেতারা কেন দোষী সাব্যস্ত হলেন? জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো ঘটনাটি নিয়ে সরকার একধরনের ধোঁয়াশা তৈরি করায় এখন ঐ প্রতিষ্ঠানটিতে বড়ো সংকট তৈরি হয়েছে।


জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন অধ্যাপক ফারজানা ইসলামকে উপাচার্য নিয়োগ করা হয়, তখন সবাই এটাকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। একজন নারী একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ পাওয়া ছিল নারীর ক্ষমতায়নের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কিন্তু আজ সেই ঔজ্জ্বল্য ম্লান হয়েছে অধ্যাপক ফারজানার নিজের অপরিণামদর্শিতা ও একদেশদর্শিতার কারণেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি সবাইকে নিয়ে চলার মতো উদারতা দেখাতে পারেননি। আমাদের দেশের রাজনীতি যেমন প্রবল প্রতিহিংসাপরায়ণ, তেমনি উচ্চশিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোও রাজনৈতিক কলহমুক্ত নয়। কেবল ভিন্নমতের দ্বন্দ্ব্ব আছে, তা-ই নয়; এক মতের মধ্যেও আছে গোষ্ঠী দ্বন্দ্ব, ক্ষুদ্র স্বার্থের খেয়োখেয়ি।


জাহাঙ্গীরনগরে এখন উপাচার্যের পক্ষ-বিপক্ষ গ্রুপ মুখোমুখি অবস্থানে। সংকট সমাধানে ছাত্রলীগ মাঠে নামায় পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। উপাচার্যের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী-শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর ৫ নভেম্বর ছাত্রলীগ হামলা চালিয়ে পরিস্থিতিকে অনেকটা পয়েন্ট অব নো রিটার্নের দিকে নিয়ে গেছে। কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের হল ত্যাগের নির্দেশ দিলেও তা অনেক শিক্ষার্থীই অমান্য করেছে। শুরুতে ফয়সালার উদ্যোগ নিলে যে ফল সহজে পাওয়া যেত, এখন আর সে সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। উপাচার্য ফারজানা ইসলামকে রেখে সম্ভবত আর সমস্যার সমাধান হবে না।


কারো বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ তুললেই তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিতে হবে এটা অবশ্যই কোনো যৌক্তিক কথা নয়। উপাচার্য পদে যাকেই নিয়োগ দেওয়া হোক না কেন, তারই পক্ষে-বিপক্ষে কেউ না কেউ থাকবেন। আমাদের দেশে এখন সবার কাছে গ্রহণযোগ্য মানুষ খু্ঁজে পাওয়া কঠিন। তার পরও চেষ্টা থাকা উচিত, কম রাজনৈতিক রঙের শিক্ষকদের উপাচার্য পদে নিয়োগ দেওয়া। একজন মানুষ রাজনৈতিক পরিচয়নিরপেক্ষ হবেন, এমন আশা করা ঠিক নয়। তবে তিনি যেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন হন, তিনি যেন আজ্ঞাবহ না হন, সেটুকু অন্তত প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, অধ্যাপক আব্দুল মতিন চৌধুরী, অধ্যাপক আব্দুল হালিম চৌধুরী প্রমুখ। তারা নিশ্চয়ই রাজনৈতিক মতনিরপেক্ষ ছিলেন না। কিন্তু প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় তারা দলবাজি করেছেন এমন অভিযোগ কি কেউ করেছেন কখনো? পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে অস্থিরতা তার পেছনে সরকারকে বিপাকে ফেলার বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, আমরা জানি না। তবে যেখানেই যখন যে অভিযোগ বা অসন্তোষের খবর পাওয়া যায়, তা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কেউ যাতে পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। সবকিছুর পেছনে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত বা বিএনপি-জামায়াত না খুঁজে ন্যায্যতা-অন্যায্যতার বিষয়টিও খোঁজা দরকার।

Comment As:

Comment (0)