উপাচার্যরা পদত্যাগ করতে চান না কেন

A+ A- No icon

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যা ঘটেছে তাতে আমরা মর্মাহত হই, ক্ষুব্ধ হই; কিন্তু বিস্মিত হই না। কেননা আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপরে ন্যক্কারজনক হামলার ঘটনা নতুন কোনো বিষয় নয়। গত এক দশকে এ ধরনের ঘটনা উপর্যুপরিভাবে ঘটেছে। কোনো ধরনের আন্দোলন করলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগের কর্মীরা শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হননি, আক্রমণ করেননি, আহত করেননি এমন ঘটনা বিরল। আমাদের স্মৃতিশক্তি এতটা দুর্বল নয়, এ ধরনের ঘটনা এতটা দূরের বিষয় নয় যে উদাহরণ খোঁজার জন্য আমাদের সংবাদপত্রের পাতার দ্বারস্থ হতে হবে। এগুলো এখন প্রতিদিনের ঘটনা।


শিক্ষার্থীরা শিক্ষাঙ্গনে এসে লাঞ্ছিত হবেন, নির্যাতিত হবেন, নির্যাতনে প্রাণ হারাবেন; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী নিবাসে টর্চার সেল থাকবে, গণরুমের নামে অত্যাচার চলবে, এগুলোকে আমরা স্বাভাবিক বলেই মেনে নিতে বাধ্য হয়েছি। ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিয়ে তাতে সায় দেবে, এটাই এখন স্বাভাবিকতা। সে জন্য তাদের অনুশোচনা নেই, দায় নেই, দায়িত্বও নেই। আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বুয়েটের উপাচার্য সাইফুল ইসলাম এটা স্বীকার করেছেন যে বুয়েটের ছাত্রাবাসগুলো ছাত্রলীগই চালায়, কিন্তু তারপরও তিনি বলেছেন, এর দায় তাঁর নয়।


এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে যদি কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী সামান্যতম প্রতিবাদের শক্তি সঞ্চয় করেন, তবে তাঁকে যতটা না বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন বা বিধির মোকাবিলা করতে হবে, যতটা না দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে মোকাবিলা করতে হবে, তার চেয়ে বেশি, তার চেয়েও ভয়াবহভাবে মোকাবিলা করতে হবে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগকে। রাষ্ট্র এবং সরকার ভায়োলেন্স এখন আউটসোর্স করে দিয়েছে। ফলে এরাই বিশ্ববিদ্যালয় এবং তরুণদের যেকোনো প্রতিবাদকে শায়েস্তা করার জন্য যথেষ্ট।


এ দায়িত্ব ঘটনাচক্রে তাঁদের হাতে গিয়ে পৌঁছায়নি, ক্ষমতাসীন দল তা জেনেবুঝেই তুলে দিয়েছে; কোনো কোনো ঘটনার পর ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে লোকদেখানো দায়িত্ব অস্বীকারের বিবৃতি দেওয়া হলেও এ ধরনের আচরণ যে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের বাইরে নয়, তা সহজেই বোধগম্য। ছাত্রলীগের এসব আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু কেবল শিক্ষার্থীরা নন, শিক্ষকেরাও। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন সরকারের সমর্থক শিক্ষকেরাও। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা এর অংশীদার। এ রকম একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জনগণের কাছে তাদের কোনো দায়বদ্ধতা নেই, আছে ক্ষমতাসীন দলের কাছে, সরকারের কাছে। দেশের জনপ্রশাসনের ক্ষেত্রে এ ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আগেই, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর দায়িত্ব হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের রক্ষা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যেখানে দায় ছিল, দায়িত্ব ছিল এর বিপরীতে দাঁড়ানোর, সেখানে নিয়োগপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ-সুবিধার কারণে তাঁদের এক বড় অংশ এখন এমন ভূমিকা পালন করে, যা ছাত্রলীগের চেয়ে কোনো অর্থেই ভিন্ন নয়।


এ রকম একটি পটভূমিকায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা ঘটেছে। এর আগেও একাধিকবার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আক্রান্ত হয়েছেন। গত কয়েক বছরে আমরা দেখতে পেয়েছি যে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কী ধরনের আচরণ করেছেন। আমরা দেখতে পেয়েছি যে উপাচার্যদের রক্ষার জন্য, উদ্ধারের জন্য ছাত্রলীগের কর্মীরা এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনার সময় এবং তারপরে আমরা নতুন কিছু প্রত্যক্ষ করেছি।


স্মরণ করা যেতে পারে যে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরবিপ্রবি) উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিনের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে ২১ সেপ্টেম্বর। ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করা হয়। সেই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মো. হুমায়ূন কবীর বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর যে হামলা করা হয়েছে, তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নির্দেশে করা হয়েছে। তিনি তাঁর প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন। শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন, হামলাকারীরা ভিসির লোকজন স্থানীয় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সফিকুর রহমান বলেন, হামলাকারীরা বহিরাগত ভিসির লোক। এটা সবার জানা ছিল যে এ হামলা কার জন্য করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন বলেছিলেন,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর কে বা কারা হামলা করেছে, তা আমার জানা নেই। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ফারজানা ইসলাম এ নিয়ে কোনো রকম রাখঢাক করেননি। তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর হামলাকে বলেছেন গণ-অভ্যুত্থান। বাংলাদেশের ইতিহাসে উনসত্তরের আন্দোলন, যার মধ্য দিয়ে জেনারেল আইয়ুব খানের পতন হয়েছিল, তাকেই গণ-অভ্যুত্থান বলে বর্ণনা করা হয়; ১৯৯০ সালে যে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে জেনারেল এরশাদের পতন হয়েছিল তাকে গণ-অভ্যুত্থান বলা হয়। প্রায়ই যাঁরা সঠিক ইতিহাসের জন্য প্রাণপাত করেন, তাঁরা গণঅভ্যুত্থান শব্দের এই ব্যবহার নিয়ে কী বলবেন, তা শোনার অপেক্ষায় থাকলাম।


শুধু তাই নয়, উপাচার্যের বাসভবনের সামনে থেকে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সরিয়ে দেওয়াকে গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম। এ জন্য তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাসহ ছাত্রলীগের প্রতিও বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কার কাছে কৃতজ্ঞ থাকছেন? তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তারা দায়িত্ব নিয়ে এ কাজ করেছে। কিন্তু এ দায়িত্ব তাদের কে দিয়েছে? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের নেতাদের সঙ্গে উপাচার্য বা শিক্ষকদের সখ্য থাকার কথা আমরা জানি, তাঁরা সবার অজ্ঞাতে কে কতটা কেন কৃতজ্ঞ থাকেন, আমরা জানি না, কিন্তু এখন একজন উপাচার্য প্রকাশ্যেই তাঁর কথা বলেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে ছাত্রলীগ কর্মীদের জন্য এ প্রত্যক্ষ কৃতজ্ঞতাই যথেষ্ট কি না।


উপাচার্য সংবাদ সম্মেলনে আরও বলেন, আমার জন্য এটা অত্যন্ত আনন্দের একটি দিন। এ কথাগুলো আমাদের মনে প্রশ্ন তৈরি করে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য, তার শীর্ষ ব্যক্তির জন্য আনন্দের দিন কোনটি? একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, তার উপাচার্যের জন্য, শিক্ষকদের জন্য আনন্দের দিন যেদিন ওই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের চর্চায় সাফল্য লাভ করেন, নতুন উদ্ভাবনের মাধ্যমে নতুন পথ দেখান, সুকুমার বৃত্তির চর্চায় অন্যদের মুগ্ধ করেন; একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ একাডেমিক পদের অধিকারীর জন্য আনন্দের দিন হচ্ছে যখন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-গবেষকেরা নতুন জ্ঞান উৎপাদন করেন, যখন শিক্ষকেরা মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে স্বীকৃতি পান, যখন শিক্ষার্থী বা শিক্ষকেরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠানের নাম উজ্জ্বল করেন, যখন শিক্ষার্থীরা তাঁদের মেন্টরদের কাছ থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনায় আলোকিত হয়ে ওঠেন। কিন্তু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা যখন আক্রান্ত, লাঞ্ছিত ও আহত হন, তখন তা কী করে একজন উপাচার্যের জন্য আনন্দের দিন হতে পারে?


পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্যদের আচার আচরণ নিয়ে, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য তাঁদের বিভিন্ন পদক্ষেপ থেকে এ প্রশ্ন বারবার উঠছে, উপাচার্য পদের এত কী আকর্ষণ? উপাচার্যরা পদত্যাগ করতে চান না। কারণ কি এই যে তাঁদের যাঁরা নিয়োগ দেন, তাঁদের অনুমতি ছাড়া উপাচার্যরা পদত্যাগ করতে পারেন না? আর নিয়োগদাতারা উপাচার্যদের পদত্যাগকে রাজনৈতিক পরাজয় বিবেচনা করেন বলেই যেকোনো মূল্যে তাঁদের টিকিয়ে রাখার ব্যাপারে তাঁদের কোনো দ্বিধা নেই।

Comment As:

Comment (0)