বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও কূটনীতি

A+ A- No icon

জীবন পুষ্পশয্যা নয়। টিকে থাকার নিরন্তর প্রতিযোগিতা চলে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি, ভাষা, জাতি কিংবা রাষ্ট্রের মধ্যে। বাংলা ভাষার ‘আঞ্চলিক প্রতিযোগী’ হিন্দি আর ‘আন্তর্জাতিক প্রতিযোগী’ ইংরেজি। পাঞ্জাবি, হিন্দুস্তানি, চীনা, বর্মি ইত্যাদি জাতি এক অর্থে বাঙালি জাতির প্রতিযোগী। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার কৌশলই হচ্ছে রাষ্ট্রের অন্তরঙ্গে রাজনীতি এবং বহিরঙ্গে কূটনীতি।

 

বাংলা ভাষা, বাঙালি সংস্কৃতি, তথা বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বার্থে একটি ভাষাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও কূটনীতির কথা ভাবতে হবে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের।  ভাষা আর সংস্কৃতির বিনির্মাণ অনেকটা দই পাতার মতো। পুরোনো খানিকটা দইয়ের সঙ্গে নতুন অনেকটা দুধ মিশে দই তৈরি হয়। দেশজ কোনো সংস্কৃতির সঙ্গে বহিরাগত একাধিক সংস্কৃতি মিশে হাজার বছর আগে বাঙালি সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়েছিল। একাধিক ভাষা মিলেমিশে সৃষ্টি হয়েছিল বাংলা ভাষা।

 

বাঙালি সংস্কৃতি, বাংলা ভাষা, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে নব নব ভাব-ভাষা-সংস্কৃতিকে গ্রহণ করতে হবে। সফল ও সুদূরপ্রসারী রাজনীতি ও কূটনীতির মূল কথা রবীন্দ্রনাথ বলে গেছেন, ‘দেবে আর নেবে, মিলাবে মিলিবে।’ শিখতে হবে, কীভাবে নিজের ভালোটুকু বেমালুম বিসর্জন না দিয়ে পরের ভালোটুকু গ্রহণ করা যায়।  মানব ইতিহাসে নেওয়ার এবং দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সফল রোমান জাতি। এতটাই সফল ছিল তারা যে লাতিন শব্দ, রোমান আইন আজও প্রাসঙ্গিক।

 

রোমান সেনাবাহিনী, রোমান যুদ্ধকৌশল ছিল প্রায় অপ্রতিরোধ্য। সাম্রাজ্য বিস্তারের কালে রোমানরা অধিকৃত অঞ্চলে লাতিন ভাষা, রোমান আইন, রোমান চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিয়েছিল। গ্রিক ভাষা লাতিনের তুলনায় উন্নত ছিল, রোমানরা গ্রিক শিখেও ছিল, কিন্তু উন্নত গ্রিক ভাষা নয়, অপেক্ষাকৃত অনুন্নত লাতিন ভাষাকে অবলম্বন করে সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিল তারা, কারণ লাতিন ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ রোমান জনগণের বোধগম্য ভাষা কিংবা মাতৃভাষা।

 

বাংলা ভাষার অস্তিত্বের স্বার্থেই বিদেশি সাহিত্যের অনুবাদ হতে হবে বাংলা ভাষায়। নব নব ভাব, শব্দ ও বাক্যবন্ধ বাংলা ভাষায় যদি প্রবেশ না করে, তবে আমাদের প্রিয় ভাষাটি সর্ব কাজে ব্যবহারযোগ্য একটি চৌকস ভাষা হয়ে উঠবে না। বাঙালি আপাতত একটি অভিবাসনপ্রবণ জাতি। অভিবাসনের প্রয়োজনে লাখ লাখ বাঙালিকে বিদেশি ভাষা শিখতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জন করতে হাজার হাজার ভাষা-শিক্ষক প্রয়োজন, প্রয়োজন শত শত ভাষা শিক্ষাকেন্দ্রের। আপাতত কলেজ পর্যায়ে কেন একাধিক ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা যাবে না? 

 

বিদেশি ভাষায় বাংলা ভাষার সাহিত্যকর্মের অনুবাদ হওয়া প্রয়োজন। সমস্যা হচ্ছে, অর্থনৈতিক দিক দিয়ে আমরা পৃথিবীর অনেক জাতির তুলনায় পিছিয়ে আছি। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা একটি জাতির সাহিত্য যত উন্নতই হোক, সেই সাহিত্য পাঠে অন্য জাতির লোকেরা সাধারণত আগ্রহী হয় না। এই সমস্যার সমাধান কী? বিপণনের ক্ষেত্রে বলা হয়ে থাকে: প্রচারেই প্রসার। বিদেশিদের বাংলা ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে দেশে এবং বিদেশে।

 

বাংলাদেশে এসে বাংলা ভাষা অধ্যয়নে ইচ্ছুক বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রদানে যেসব অহেতুক জটিলতা এখনো আছে, সেগুলো দূর করতে হবে।  ফরাসিরা আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ, ইংরেজরা ব্রিটিশ কাউন্সিল, আমেরিকানরা আমেরিকান সেন্টার এবং সোভিয়েতরা রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছিল। সাম্প্রতিক কালে চীনারা প্রতিষ্ঠা করছে কনফুসিয়াস সেন্টার। পৃথিবীর সর্বত্র লাখ লাখ ইউয়ান বৃত্তি দিচ্ছে তারা চীনা ভাষা শেখাতে, চীনে গিয়ে লেখাপড়া করতে।

 

এই সংস্কৃতিকেন্দ্রগুলোর অন্যতম লক্ষ্য সংশ্লিষ্ট জাতির ভাষা ও সংস্কৃতি প্রচার। উন্নত জাতি মাত্রেই নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি প্রচারের ওপর জোর দেয়, রোমানরা যেমনটা করেছিল। জনসংখ্যা বৃদ্ধিবিমুখ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে শুধু সংখ্যার কারণেই বাঙালি জাতি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান পেয়ে যাবে। ভবিষ্যতের সেই অবস্থানকে ন্যায়সংগত ও টেকসই করার স্বার্থে বর্তমানে জ্ঞানচর্চা বাঙালির আশু কর্তব্য। অতীতের একাধিক অগ্রসর জাতির ইতিহাস আমাদের শিখিয়েছে, কার্যকর এবং সর্বজনীন জ্ঞানচর্চার অপরিহার্য মাধ্যম হতে হবে সংখ্যাগরিষ্ঠের মুখের ভাষা, অর্থাৎ আমাদের ক্ষেত্রে বাংলা। 

 

ফরাসি কিংবা ইংরেজি ভাষা শিক্ষাদানের জন্য শ খানেকের ওপর ম্যানুয়েল রয়েছে। বাংলা ভাষা শিক্ষাদানের জন্য কয়টি ম্যানুয়েল আছে? বাংলা ভাষাজ্ঞান পরীক্ষার জন্য টোফেল বা আইইএলটিএসের মতো পরীক্ষা আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কথা বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকেরা কখনো ভেবেছেন কি? বাংলা ভাষাকে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে হলে এসব ম্যানুয়েল ও পরীক্ষার বিকল্প নেই। এসব ম্যানুয়েল তৈরি এবং পরীক্ষা উদ্ভাবনে অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। 

 

সরকার সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের শান্তিনিকেতনে একটি বাংলাদেশ ভবন প্রতিষ্ঠা করেছে। মিলনায়তন, সেমিনার কক্ষ, জাদুঘরসংবলিত সুনির্মিত, সুদৃশ্য এই ভবন ইতিমধ্যে সারা ভারতের বাঙালিদের একটি দ্রষ্টব্য স্থানে পরিণত হয়েছে। ভারতের চার প্রান্তে চারটি এবং পৃথিবীর বিখ্যাত শহরগুলোতে একটি করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র কিংবা বাংলাদেশ ভবন প্রতিষ্ঠা করা যায় নাকি? এর ফলে বিদেশিরা বুঝবে, বাঙালি শুধু তাদের দেশে এসে ‘চিড়া খেয়ে’ কামলা দেয় না। আপাতত গরিব হলেও তাদের একটি উন্নত ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে।

 

বিদেশিরা বাংলাদেশ ভবনে এসে বাংলা ভাষা শিখবে, বাঙালি সংস্কৃতিকে জানবে। বাংলা ভাষা শিক্ষাকে উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন জাতির শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দিতে হবে। বিদেশি বাংলা শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ কালক্রমে নিজের ভাষায় বাংলা ভাষার সাহিত্যকর্ম অনুবাদে ব্রতী হবেন। ভাষাকেন্দ্রিক কূটনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভবন একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিঘাত সৃষ্টি করবে। বাংলাদেশের নাড়ির সম্পর্ক যে ভাষাটির সঙ্গে, সেই বাংলা ভাষায় বিনিয়োগের অর্থ কোথা থেকে আসবে?

 

রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন ব্যক্তিরা কৈশোরে রপ্ত করা ঐকিক নিয়মের জ্ঞান ব্যবহার করে নির্ধারণ করতে পারেন, একটি সেকেন্ডহ্যান্ড রুশ মিগ বিমান কিংবা চীনা সাবমেরিনের অর্থমূল্যে কয়টি বাংলাদেশ ভবন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। ঐতিহাসিকভাবে যুদ্ধবিমুখ এই দেশে ব্যবহার না হতে হতে মিগগুলো অদূর ভবিষ্যতে মরিচা কিংবা হাওয়ায় আক্ষরিক অর্থে ‘উড়ে যাবে’ এবং সাবমেরিনগুলো আগে–পরে আক্ষরিক অর্থে ‘জলেই যাবে’।

 

কিন্তু বাংলা ভাষায় আজ যে বিনিয়োগ হবে, বাঙালি তার সুফল পাবে হাজার বছর ধরে। ভাষাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও কূটনীতির সঠিক প্রয়োগ হলে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি দীর্ঘস্থায়ী হতেও পারে, অনেকটা লাতিন ভাষা ও রোমান আইনের মতো। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসারের একটি দশসালা প্রকল্পে ঠিকঠাকমতো বিনিয়োগ করা গেলে বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বলতর হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। 

Comment As:

Comment (0)