ভোগ্যপণ্যের বাজারে করোনার প্রভাব

A+ A- No icon

বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের ফলে আমাদের সামনে যে সংকট উপস্থিত হয়েছে, তা মোকাবিলার সর্বোচ্চ চেষ্টাই আমাদের সবার এই মুহূর্তের প্রধান কর্তব্য। বাংলাদেশে এখনো এই ভাইরাস ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি, তা যাতে না ঘটে সেই চেষ্টা সরকারি, বেসরকারি, প্রাতিষ্ঠানিক, পারিবারিক, ব্যক্তিগত সব পর্যায়েই করতে হবে। ভাইরাস প্রতিরোধের পাশাপাশি এই সংকটের অনুষঙ্গ হিসেবে আরও যেসব সমস্যা দেখা দিতে পারে, সেগুলোর কথাও আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত। একটি সমস্যা ইতিমধ্যে স্পষ্ট হতে শুরু করেছে: দেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে নেতিবাচক প্রভাব দেখা দিয়েছে। লোকজন চাল-ডালসহ নানা রকমের ভোগ্যপণ্য প্রয়োজনের তুলনায় বেশি পরিমাণে কেনা ও মজুত করা শুরু করেছে—এমন খবর জাতীয় সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে।


কিন্তু এর কোনো প্রয়োজন নেই; বরং এর ফল আমাদের সবার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য কিনে বাসায় মজুত করার প্রয়োজন নেই এই কারণে যে আমাদের দেশে এসবের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। সরকারের তরফ থেকে এমন কথা বলা হয়েছে; বাজারে পণ্য সরবরাহের চিত্র থেকেও তা পরিষ্কার ছিল। কোনো ভোগ্যপণ্যের ঘাটতির খবর কয়েক দিন আগ পর্যন্তও ছিল না। এ অবস্থায় সবাই যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য কেনা মজুত করা শুরু করি, তাহলে বাজারে যে সংকট দেখা দিতে পারে, তার কারণ হব আমরা নিজেরাই। অর্থাৎ করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোর মতো গুরুতর সংকটময় পরিস্থিতিতে আমরা নিজেরাই আরও একটা বাড়তি সংকট সৃষ্টি করব, এবং তার ফল কারও জন্যই ভালো হবে না।


বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি করোনাভাইরাসের কারণে আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য না কিনতে ভোক্তাদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, দেশে নিত্যপণ্যসহ সব পণ্যেরই মজুত ও সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। তাই অপপ্রচার সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে এবং ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে। সমস্যা হলো বাংলাদেশে সরকারি বক্তব্যের প্রতি জনসাধারণ সব সময় আস্থা বোধ করতে পারে না। কারণ, তাদের অভিজ্ঞতা এই যে সরকার কখনো কখনো সঠিক তথ্য প্রকাশ করে না। এ রকম পরিস্থিতিতে প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে সঠিক ধারণা পাওয়া জনসাধারণের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত ভোগ্যপণ্যের বাজারে সরবরাহ যেহেতু স্বাভাবিক ছিল, সেহেতু বাণিজ্যমন্ত্রীর আশ্বাস ছাড়াই এ সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকা যেত। কিন্তু তারপর প্রায় হঠাৎ করেই ভোগ্যপণ্য কেনাকাটায় একধরনের উল্লম্ফন শুরু হওয়ার পর যে নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে বা ঘটতে চলেছে, তাতে বাণিজ্যমন্ত্রীর আশ্বাস কতটা ফলদায়ী হবে তা বলা কঠিন।


কারণ, প্রথমত, সরকারি আশ্বাসে জনসাধারণের সংশয়, আতঙ্ক, উদ্বেগ কাটে না। দ্বিতীয়ত, এ রকম অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে সুযোগসন্ধানী মানুষেরা বাড়তি মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে। ফলে এখন সমস্যাটা উভয়মুখী: একদিকে অনিশ্চয়তায় ভোগা জনসাধারণ সামনের দিনগুলোর জন্য সাধ্যমতো ভোগ্যপণ্য সংগ্রহের চেষ্টা করবে; অন্যদিকে সুযোগসন্ধানী ব্যবসায়ীরা বাড়তি মুনাফার লোভে সংকট আরও বাড়াতে ভোগ্যপণ্যের মজুতদারিতে লিপ্ত হতে চাইবে।


সরকারের দায়িত্ব অত্যন্ত কঠোর হাতে এ পরিস্থিতি সামলানো। কেউ যেন মজুতদারির কোনো সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। এ কাজে সরকারকে সহযোগিতা করতে পারেন ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর নেতারা। জনসাধারণের উচিত হবে বাণিজ্যমন্ত্রীর অনুরোধ রক্ষা করা: প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভোগ্যপণ্য কেনা থেকে বিরত থাকা।

Comment As:

Comment (0)