গোলাপীরা এখনো ভয় পায়

A+ A- No icon

একাত্তোরের স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় ঘোষণার কয়েক মাস আগের ঘটনা। রাত তখন ১০টা। সমস্ত কাঞ্চনা গ্রাম ভূতরে পুরী। ঘুট্‌ঘুটে আঁধারে ডুবে আছে। সাতকানিয়া-বাঁশখালী রোডের চুড়ামনি পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত পাকবাহিনীর ক্যাম্প থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সন্ধ্যার পর কেউ আলো নিয়ে ঘর থেকে বের হতে পারবে না। টহলদার পাকসেনারা আলো দেখলে গুলি ছোঁড়বে। প্রয়োজনেও লোকজনকে আলো ছাড়া বের হতে হবে। তাই কারো ঘরের উঠানে আর বাতি জ্বলে না।। রাতে মাঠের পরের পাড়াগুলো কুছকুছে কালো বোরকা পরে আছে। গাছগাছালি দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা সমগ্র গ্রামকে গ্রাস করেছে। 


রাজাকার রসিদ আর সুলতান রাস্তার পাশের হতদরিদ্র গোবিন্দের বাড়ির ওঠনে দাঁড়িয়ে নিস্তব্ধতা ভেদ করে ডাক ছাড়ে, গোবিন্দ কাকা বাড়ি আছো? একটু বাইরে আসেন। রাতে পাকসেনার দোসর বর্বর রাজাকারের কণ্ঠ শুনে ভয়ে গৌবিন্দের বুকটা জ্বলন্ত প্রদীপের শিখার মত দপ দপ করতে থাকে। তাদের নির্মম অত্যাচারে গ্রামবাসীর প্রাণ ওষ্ঠাগত। তাই পাশের বাড়ির লোকজন ঘরের বাতি নিবিয়ে কবরে শায়িত মৃত ব্যক্তি সেজে যায়। অদূরে নেড়িকুত্তাটা ডেকেই চলেছে। ভয়ে জড়সড় গৌবিন্দের জিবের পানি শুকিয়ে উঠে। ঘরের ভেতর তিন প্রাণী পাথরের মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকে। কারো মুখে রা শব্দটি নেয়। আবার রাজাকার রসিদ হাঁক ছাড়ে, তড়া আসেন কাকু। ষাটোর্ধ বয়সের অস্থিচর্মসার গোবিন্দ কম্পিত হাতে ভাঙা বাঁশের দরজাখানা টেনে বের হয়ে আসে। কাঁধের ছেঁড়া গামছার এক মাথা করজোড় হাতের মাঝখানে রেখে বিনীত কণ্ঠে বলে, বাবা রসিদ, কেন ডাকছো? রসিদ সহাস্য বদনে বলে, কাকা গোলাপী কই? বড় ভাল খবর আছে। প্রশ্ন শোনে গোবিন্দের কলিজাটা ছেড়ে য়ায়। ঠোঁট দুটো কাঁপতে থাকে। ক্ষীণ স্বরে বলে, কেন বাপজান?


-মেজর সাহেব গোলাপীকে যাবার জন্য কইছে। গোলাপীর উপর সাহেবের অনেক মোহাব্বত আছে। গোলাপীকে আমার সাথে যেতে হবে।
-বাপজান আমাকে মাপ কর, মোর বিয়াবয়সী মেয়েটারে যাইতে দিতে পারুম না।
– কাকা, মেজরের হুকুম আছে।
-না- না আমি পারবো না। গৌবিন্দ রসিদের পা জড়িয়ে ধরে।
-ভয় করেন কেন? আমি আছি না। গোলাপী আমার বোননা, তার ক্ষতি করতে দিতে পারি।
-না চাচা, আমারে মাপ করেন। মেজরে বুঝিয়ে কন, মায়াটার বড় অসুখ। 


অন্যদিকে রাজাকারের প্রস্তাব শুনে গোলাপী ভয়ে বনরুইয়ের মত জড়সড় হয়ে ঘরের কোনে আশ্রয় নেয়। মা সীতারাণী দরজার খুঁটি ধরে কাঁদতে থাকে। সে জানে, বর্বর রসিদ নাছোড়বান্দা। রসিদ গৌবিন্দকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়ে। টেনে হেঁচড়ে গোলাপীকে বের করে নিয়ে আসে। গোলাপী কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার করে বলে, আমারে ছাইড়া দেন। আপনেরা অ্যামার ধর্মস্থ ভাই। আমারে ছাইড়া দেন। অ্যামি যাবো না। আমারে মাপ কইরা দেন। রসিদ উত্তপ্ত কণ্ঠে গর্জে উঠে, বেশী পাজাপাজী করিস না। ভাল হইবো না। সাহেবের অর্ডার শোনতে হইবো। টেনে নিয়ে জোর করে রিকশায় উঠিয়ে দেয়। গোলাপীর নিষ্ফলা আত্মচিৎকার নিস্তব্ধ রজনীর বুক ছিঁড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। রাইফেলের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসার সাহস করে না। প্রতিবাদ করলে হতো মৃত্যু নতুবা রাইফেলের বাটের আঘাতে পঙ্গুত্ব বরণ। তাই অসহায় পাথরের মূর্তির চোখে নীরবে জল ঝরে।


অসহায় হতভাগা গৌবিন্দ রাতে নিস্তব্ধ অন্ধকারে কালের সাক্ষী বাপদাদার আমলের উঠোনের আম গাছটির গোড়ায় বসে দু’হাঁটুর মাঝখানে মাথা রেখে নীরবে কাঁদতে থাকে। বৌ সীতারাণী দরজার মাটিতে লুটে পড়ে জবায় করা মুরগির মত বুক চাপড়াতে থাকে। এক সময় মুক্তির কামনায় দুর্ভাগিনী গোলাপীর বুকফাঁটা চিৎকার অন্ধকারে মিলিয়ে যায়। কুলাঙ্গার বর্বর রাজাকার তাদের অত্যাচারী পাকিস্তানী বাপের সন্তুষ্টির জন্য গোলাপীকে ভোগের পণ্য হিসেবে তুলে দিতে ছুটে চলে। ক্যাম্পে পাকবাহিনীর বর্বর পশু মেজর অপেক্ষা করতে থাকে, কবে আনা হবে হীনলালসা মিটাতে মাংসপিণ্ডখানি। মদের গ্লাসে চুবিয়ে হিংস্র দন্তে চিবিয়ে জঘন্য ক্ষুধা মিটাবে।


মাইল দুয়েক পথ অতিক্রম করে রিকশা ক্যাম্পে পৌঁছলে রাজাকার রসিদ সালাম দিয়ে রক্তচক্ষুর মেজরের হাতে গোলাপীকে তুলে দেয়। মেজর রসিদের পিঠে হাত বুলিয়ে চলে যেতে বলে। দরজা বন্ধ হয়ে যায়। গোলাপীর নিষ্ফলা আকুতির চিৎকার থামে না। এক সময় অসহায় গোলাপীর ক্রন্দনের মৃত্যু ঘটে। রাজাকার রসিদ, সুলতান বারান্দার টুলে বসে বিড়িতে আগুন দেয়। রসিদ বিড়িতে লম্বা করে টান দিলে বিড়ির মাথার আগুনটা চিতার আগুনের মত জ্বল জ্বল করে উঠে। আযান পড়ার ঘণ্টাখানেক আগে নরপিশাচ মেজর দরজা খুলে রসিদকে ডাক দেয়। রসিদ কাছে এলে তার হাতে কিছুটাকা গুজিয়ে দিয়ে গোলাপীকে নিয়ে যেতে বলে। রসিদ রুমে ঢোকে ছিন্নবস্ত্রে জড়ানো শকুনের উচ্ছিষ্ট গোলাপীর ক্ষতবিক্ষত দেহখানি রিকশায় তুলে নিয়ে গৌবিন্দের বাড়ি উদ্দেশে ছুটে চলে।


বাড়ি পৌঁছলে রিকশা থামিয়ে গোলাপীকে নামিয়ে নেয়। গোলাপীর হাঁটার শক্তি হারিয়ে ফেলে। রসিদ গোলাপীর ডান বাহু কাঁধে নিয়ে জড়িয়ে ধরে টানতে থাকে। পথপানে চেয়ে থাকা মা সীতারাণী মেয়েকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরে। মেয়ের ক্ষতদেহের রক্তে মায়ের বুক ভিজে উঠে। মেয়ের যন্ত্রণায় সীতারাণী কেঁদে দেয়। -কোন্‌ পাষণ্ড মায়াখানের এত বড় সর্বনাশ করলো? মায়াটা তোরার কি অপরাধ করছে? কেন মায়াটারে নষ্ট করে দিলি? ভগবান তুমি বিচার করো। গোলাপী মাথাটা মায়ের কাঁধে হেলিয়ে দেয়।


রসিদ গোবিন্দকে টেনে তুলে, বিদ্রূপের কণ্ঠে বলে, কাকু গোলাপী একটুখান ব্যথা পাইছে। এ’টাকাখান রাখেন। সকালে ডাক্তর দেখায়েন। গোবিন্দের চোখ বেয়ে জল নামে। হাতে গুঁজিয়ে দেয়া টাকা কয়টি হাত থেকে খসে পড়ে ধুলোয় গড়ায়। আযান পড়ে। ভোরের হাওয়া বইতে থাকে। মাটিতে গড়ানো টাকা কটা বাতাসে ধড়ফড় ধড়ফড় করে কাঁপতে থাকে। রসিদ সুলতানকে বলে, আযান পড়ছে। চল্‌ নামাজ পড়তো হবে। নামাজের জন্য তারা চলে যায়।


২/৩দিন পর। রাত ৭/৮টা। রাজাকার রসিদ তার সহযোগী সুলতানকে নিয়ে গোবিন্দের বাড়িতে হাজির। গোবিন্দ তখনো বাজার থেকে ঘরে ফেরে নি। রসিদ ডাক দেয়, গোবিন্দকাকু আছো? রসিদের কণ্ঠ শুনে সীতারাণীর হাত থেকে জ্বলন্ত বাতিটা মাটিতে পড়ে নিবে যায়। ঘরে অন্ধকার নেমে আসে। হিংস্র পশুর সাক্ষাতে সীতারাণী কাঁপতে থাকে। কম্পিত কণ্ঠে বলে, বাজার থেকে এখনো আয় ন।
-চাচী, গোলাপী কই? সীতারাণীর কণ্ঠ কাঠ হয়ে আসে। ভাষা হারিয়ে ফেলে।
-ভয় নেই চাচী। নিতে আসি ন। তার শরীরের খবরখান জানতে আসছি।


শুয়ে থাকা গোলাপী রসিদের কণ্ঠ শুনে গায়ের কাঁথাখানি সর্ব শরীরে মুড়ি দিয়ে জড়সড় হয়ে পড়ে থাকে। ঘটনার পর থেকে লজ্জায় সে ঘর থেকে বের হয় নি। কী চাচী, কথা কন না কেন? বলে, রসিদ অন্ধকার ঘরে ঢুকে পড়ে। হাতের টর্চ জ্বালিয়ে যন্ত্রণায় কাতর শরীর নিয়ে শুয়ে থাকা গোলাপীকে খোঁজে নেয়। তার গায়ের কাঁথাখানি টেনে ছুঁড়ে ফেলে পশু রসিদ হীনলালসা মিটাতে গোলাপীর শরীরের উপর হিংস্র দন্ত বসায়। গোলাপী চিৎকার দিয়ে নিস্তেজ হয়ে যায়। মেয়ের চিৎকার শুনে সীতারাণীও সংজ্ঞা হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। নরপশুরা হতভাগী গোলাপীর দেহখানি ছিন্নভিন্ন করে চলে যায়।


ঘণ্টা দেড় পড়ে গোবিন্দ বাড়ি এসে ঘরে আলো না দেখে সীতাকে ডাকে। কোন সাড়া না পেয়ে দিয়াশলাই জ্বালায়। সংজ্ঞাহীন সীতাকে দেখে চোখে মুখে জল ছিটিয়ে ডাকাডাকি করে। সীতার কোন সাড়া পায় না। বাতি নিয়ে গোলাপীর রুমে যায়। গোবিন্দের হাতের বাতিখানি কাঁপতে থাকে। শক্ত করে ধরে রাখার চেষ্টা করে ও পারছে না। বাতিটা পাশে রেখে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠে, এ কি করলিরে মা? কেন তুই ফাঁসিখালি? অঝোরে গোবিন্দ কাঁদতে থাকে।


অপমানের গ্লানি, নরপশুর অত্যাচারে দৈহিক যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেড়ে গোলাপী ফাঁসিতে ঝুলে আত্মহত্যার মাধ্যমে নিষ্ঠুর পৃথিবী হতে চিরবিদায় নেয়। তার শরীর থেকে উরু বেয়ে পদ্মা-মেঘনা-যমুনার আঁকা বাঁকা স্রোতের মত রক্তধারা পায়ে নেমে আসে। আর ফোঁটা ফোঁটা মাটিতে ঝরে। সিক্ত হয় মা মাটি। ঝরে পড়া গোলাপীদের বুকের রক্ত থেকে জন্ম নেয় একটি নতুন দেশ। বিশ্বের মান চিত্রে যার নাম বাংলাদেশ। কিন্তু গোলাপীরা এখনো ভয় পায়, রাজাকারেরা যদি আবার ফিরে আসে অন্যরূপে।

Comment As:

Comment (0)