‘কেবল পাঠ করার বিষয় নয়, চর্চা করার বিষয়’

A+ A- No icon

আহমদ ছফা (৩০ জুন ১৯৪৩ – ২৮ জুলাই ২০০১ ) বীর চট্টলার কীর্তিমান সিংহপুরুষদের মধ্যে অন্যতম। বুদ্ধিদীপ্ত তারুণ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় আহমদ ছফা আমাদের গর্বের ধন। অন্যায়-অপকর্মের বিরুদ্ধে ঠোঁটকাটা হবার অপরাধে সমগ্র দেশের শ্রেষ্ঠতম সাহসী ও শক্তিশালী সাহিত্যিক এবং গণবুদ্ধিজীবী হবার পরও তিনি চির অবহেলিত। এমনকী চট্টগ্রামের কৃতি পুরুষ স্বয়ং চট্টগ্রামেই উপেক্ষার শিকার। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য চরম লজ্জার বিষয়। একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক আহমদ ছফার প্রতিটি সৃষ্টিকর্ম শিল্পের বিচারে কালোত্তীর্ণ এবং এসব সৃষ্টিকর্ম চট্টগ্রামের মর্যাদাকে প্রশ্নাতীতভাবে উজ্জ্বল করেছে। আহমদ ছফার মতো বহু গুণে গুণান্বিত একজন মহামানব কেন এতো অবহেলিত! এই বিষয়ে আলোচনা সঙ্গত কারণেই সময়ের দাবি।


আলোচনার সুবিধার্থে প্রথমে আহমদ ছফার পরিচয় সংক্ষেপে জেনে নেওয়া উচিত। আহমদ ছফা ৩০ জুন ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম জেলার চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর ইউনিয়নের গাছবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হেদায়েত আলী এবং মাতা আসিয়া খাতুন। দুই ভাই চার বোনের মধ্যে আহমদ ছফা ছিলেন বাবা-মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। আহমদ ছফার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয় তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ গাছবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আহমদ ছফা ১৯৫৭ সালে নিকটস্থ নিত্যানন্দ গৌরচন্দ্র উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ছাত্রাবস্থায় সুধাংশু বিমল দত্তের মাধ্যমে কৃষক সমিতি-ন্যাপ বা তৎকালীন গোপন কমিউনিস্ট পার্টির সাথে যুক্ত হয়ে পড়েন। মাস্টারদা সূর্যসেনের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরা কয়েকজন বন্ধু মিলে চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন উপড়ে ফেলেন। পরে গ্রেফতার এড়াতে কিছুকাল পার্বত্য চট্টগ্রামে আত্মগোপন করেন। ১৯৬২ সালে চট্টগ্রাম নাজিরহাট কলেজ থকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন এবং একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে স্নাতক সম্মান প্রথম বর্ষে ভর্তি হন। পরে বাংলা বিভাগে ক্লাস করা অব্যাহত রাখেননি।

 

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কলেজ থেকে প্রাইভেটে দ্বিতীয় শ্রেণিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে এমএ পরীক্ষা দেয়ার আগেই বাংলা একাডেমির পিএইচডি গবেষণা বৃত্তির জন্য আবেদন করেন এবং তিন বছরের ফেলোশিপ প্রোগ্রামের জন্য মনোনীত হন। মাস্টার্স সম্পন্ন করার পূর্বেই পিএইচডি ফেলোশিপ নির্বাচিত হওয়া ছিলো বিরল ঘটনা। ছফার অসাধারণ ধী-শক্তির কাছে প্রচলিত নিয়মও হার মানতে বাধ্য হয়েছিলো। ছফার গবেষণার বিষয় ছিল “১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার মধ্যবিত্ত শ্রেণির উদ্ভব, বিকাশ, এবং বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে তার প্রভাব।” ১৯৭০ সালে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের জন্য জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে আসেন। দীর্ঘকাল তাঁদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় থাকে। জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাকের সান্নিধ্যে জ্ঞানের জগতে বহুমুখী পদচারণার কারণে নির্দিষ্ট বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করা ছফার পক্ষে পরে আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ২৮ জুলাই ২০০১ তারিখ মৃত্যুবরণের পূর্বে ছফা রেখে গেছেন মূল্যবান গুপ্তধনের খনি, অসংখ্য সৃষ্টিসম্ভার। তাঁর সাহিত্যসমগ্র নয় খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে।


মহাত্মা আহমদ ছফা সম্পর্কে বাংলাদেশের খ্যাতিমান জ্ঞানসাধকগণ কী বলেছেন, তাও দেখে আসা উচিত। গণবুদ্ধিজীবী ড. সলিমুল্লাহ খাঁনের মতে, “মীর মশাররফ হোসেন ও কাজী নজরুল ইসলামের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাঙালি মুসলমান লেখক হলেন আহমদ ছফা”। আবুল ফজলের মতে, “ছফার ওঙ্কার (১৯৭৫ সালে প্রকাশিত) বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের সর্বোত্তম সাহিত্যিক বহিঃপ্রকাশ।” আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতে, “ছফা গল্প বলার কলা অল্পবয়সেই রপ্ত করেছিলেন। তাই পাঠকরা তাঁর ডাকে সাড়া দেয়।” জ্ঞানতাপস অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মতে, “ছফার রচনাবলী গুপ্তধনের খনি এবং তাঁর সাহিত্যকর্ম স্বকীয় এক জগতের সৃষ্টি করে যে জগতে যে কোন পাঠক হারিয়ে যেতে পারে।” আহমদ শরীফ ছফাকে মূল্যায়ন করেছেন এভাবে, “সুবিধাবাদীর ‘Life is a compromise’ তত্ত্বে ছফার আস্থা নেই। আজকের বাংলাদেশে এমন স্পষ্ট ও অপ্রিয়ভাষী আরো কয়েকজন ছফা যদি আমরা পেতাম, তাহলে শ্রেয়তর পথ স্পষ্ট হয়ে উঠত।” মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতে, “আহমদ ছফা চুলের ডগা থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত একশ ভাগ খাঁটি সাহিত্যিক। আমাদের বড় সৌভাগ্য তাঁর মতো একজন প্রতিভাবান মানুষের জন্ম হয়েছিল।” হুমায়ূন আহমদ আহমদ ছফাকে “অসম্ভব শক্তিধর একজন লেখক” বলে অভিহিত করেছেন এবং তাঁকে নিজের মেন্টর বলে উল্লেখ করেছেন। আহমদ ছফার বহুমুখী সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কে তাঁর বন্ধু বুদ্ধিজীবী ফরহাদ মজহার বলেছেন “সে (ছফা) গাছবাড়িয়া গ্রাম থেকে আসা অতি সাধারণ একটি গ্রামের ছেলে। কিন্তু সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিন্তা ও রাজনীতির জগতে সে যে উথালপাথাল ধাক্কা দিয়ে গেল তার ফলে বাংলাদেশের সাহিত্য বলি, সংস্কৃতি বলি, রাজনীতি বলি, বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড বলি তার সঙ্গে খোদ একটা বোঝাপড়া না করে কোনো ক্ষেত্রেই অগ্রসর হওয়া যাবে না।”

 


ভাবতেই গর্বে বুক ফুলে ওঠে যে, ছফা রত্নগর্ভা চট্টগ্রামের সন্তান। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ছফাকে সমগ্র বাংলাদেশের মতো চট্টগ্রামও ধারণ করতে পারেনি। চট্টগ্রামের সূর্যসন্তান স্বয়ং জন্মভূমিতেই অবহেলিত। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখ কথাশিল্পী এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট শামীমা আক্তার শিউলী আহমদ ছফার স্মৃতিধন্য চন্দনাইশ উপজেলায় ছফাস্মৃতি দর্শনের উদ্দেশ্যে যান। তাঁর সাথে ছিলেন চট্টগ্রামের একজন গুণী কবি ও গবেষক। তাঁরা চেনার সুবিধার্থে প্রথমে চন্দনাইশ থানায় যান। চন্দনাইশ থানার ওসি এবং কর্তব্যরত পুলিশকর্তাদের মধ্যে কেউ তো ছফাকে চেনেনই না, বরং ছফার ঠিকানা জানতে চেয়ে এডভোকেট শামীমা উল্টো বিড়ম্বনার স্বীকার হন। আহমদ ছফার ঠিকানা জানতে চেয়ে সহায়তা চাইলে কর্তব্যরত অফিসার জানালেন, আমি এখানে নতুন এসেছি, জনাব আহমদ ছফার সাথে এখনো আমার পরিচয় হয়নি। এডভোকেট শামীমা চমকে ওঠে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, কী বলেন! আপনি কি সত্যি আহমদ ছফাকে চিনেন না? এবার কর্তব্যরত অফিসার বিনয়ের সাথে বললো, আহমদ ছফাকে চিনতে না পারার জন্য আমি আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি খুব সহজে যে কোন মানুষের সাথে মিশে যেতে পারি। ইনশাআল্লাহ খুব দ্রুত উনার সাথে পরিচিত হয়ে নেবো।


এই বয়ানটুকু ঘটনার দিনই সরাসরি এডভোকেট শামীমার জবান হতে শুনা। এবার চিন্তা করে দেখুন, আহমদ ছফার মতো ব্যক্তিত্বকে তাঁর বাড়িতে কর্মরত একজন সরকারি কর্মকর্তা চিনেন না, এর চেয়ে লজ্জার আর কী হতে পারে! অতি সম্প্রতি চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান এলাকা নান্দনিকরূপে সজ্জিত করা হয়েছে। কিছুদিন পূর্বে নগরীর এই অপরূপ সাজ দেখে আমি থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। পায়ে হেঁটে হেঁটে সুন্দরী নগরীর নতুন রূপ দেখছিলাম আর মুগ্ধ হচ্ছিলাম। দেয়ালে নানানরঙের মিশেলে লেখা হয়েছে বিখ্যাত ব্যক্তিদের বিখ্যাত উক্তি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, আহমদ শরিফ হতে শুরু করে হালের কম খ্যাত বিশিষ্টজনদের উক্তি জামালখানের দেয়ালে শোভা পাচ্ছে। হঠাৎ একটি বিষয় লক্ষ্য করলাম, আহমদ ছফার কোন উক্তি নাই! চরম শক খেলাম! বাংলাদেশে আহমদ ছফার চেয়ে শক্তিমান ও সাহসী কোন লেখক এখনো পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখেনি। আর খোদ আহমদ ছফার জন্মভিটায় আহমদ ছফাকে মূল্যায়ন করা হয়নি! এটি মেনে নেবার মতো নয়। এমনও না যে, আহমদ ছফার তেমন উল্লেখ করবার মতো বিখ্যাত কোন উক্তি নেই।

 

আহমদ ছফার সমগ্র সাহিত্যের প্রত্যেকটি বাক্যই ওজনে পাহাড় সমান, গভীরতায় আটলান্টিকসম আর উচ্চতায় আকাশ ছুঁয়ে যায়। সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান মেয়র সৎ-সজ্জন হিসেবে সুপরিচিত। তিনি বন্দর নগরীর অনেক পরিবর্তনের কর্তা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস মেয়রের অগোচরে চতুরতার সাথে এই কাজটি সম্পাদন করা হয়েছে। আমাদের শিল্প-সাহিত্যের কর্মীদের জোর দাবি থাকবে, নগরপিতা অতি দ্রুত বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন এবং বীর চট্টলার কীর্তিমান পুরুষ আহমদ ছফার কোন উক্তি খুদাই করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। মহাত্মা আহমদ ছফা জাতির প্রেরণার উৎস। চট্টগ্রামের মাটিতে জন্মগ্রহণ করে বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং চিন্তার জগতে ঝড় তোলে আহমদ ছফা সন্দেহাতীতভাবে চট্টগ্রামকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর কর্মময় জীবন চট্টগ্রামবাসীর প্রেরণার উৎস। সরদার ফজলুল করিমের ভাষ্যমতে, “ছফা কেবল পাঠ করার বিষয় নয়, চর্চা করার বিষয়।” ছফার জন্মভূমি চট্টগ্রাম হতেই শুরু হোক বৃহৎ পর্যায়ে আহমদ ছফাকে নিয়ে চর্চা। ছফাচর্চার মাধ্যমে চট্টগ্রামে দেশপ্রেমিক একটি বুদ্ধিভিত্তিক শ্রেণি গড়ে উঠুক সেই প্রত্যাশাই থাকবে।

Comment As:

Comment (0)