কাফকার জগতে

A+ A- No icon

কাফকা নামটি শুনলেই মনে ভেসে ওঠে কেন্দ্রচ্যুত এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ পরিবার থেকে, পরিবেশ থেকে, এমনকি নিজের থেকেও বিচ্ছিন্ন। কাফকা ছাড়া আধুনিক সাহিত্যের সকল আলোচনাই অসম্পূর্ণ। বিশেষ করে ১৯১৫ সালে প্রকাশিত তার ‘মেটামরফোসিস’ কথাসাহিত্যে এক পরাবাস্তব জগৎ সৃষ্টি করে উনিশ আর বিশ শতকের মধ্যে যোজন দূরত্ব তৈরি করে দিয়েছে।


কাফকা আমাকে কেন এতো টানে? আমিতো ছাপোষা বাঙালি, ছেলেমেয়ে, গিন্নি নিয়ে ভালোই আছি। আমার তো চেকোস্লোভাকিয়ায় কোনো এক জার্মান ভাষাভাষী ইহুদি পরিবারে বড় হবার, প্রেমে ব্যর্থ হবার, কোনো এক অবসাদগ্রস্ত জীবনের অন্ধ কানাগলিতে আটকে থাকার অভিজ্ঞতা নেই; আমিতো ভোরে উঠে বদ্ধ ঘরে নিজেকে নোংরা গা ঘিনঘিনে পোকা হিসেবে খুঁজে পাই না। তবু কাফকা আমাকে টানে। জীবনানন্দ দাশ কি ভুল বলেছেন : ‘আরো এক বিপন্ন বিস্ময়/ আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে/খেলা করে’।


ফ্রানৎস কাফকা বিচ্ছিন্নতাবাদের কবি। অডেন তাকে বলেছেন ‘বিংশ শতকের দান্তে’। জার্মানভাষী বোহেমিয়ান লেখক কাফকাকে বিংশ শতাব্দীর সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসাবে গণ্য করা হয়। তার রচনা, বাস্তবতা এবং কল্পনাপ্রসূত উপাদানগুলোকে মিশেল করে তার নায়কেরা এন্টি-হিরো, যারা সামাজিক-আমলাতান্ত্রিক শক্তির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পরাজিত।


কাফকার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ লেখা যেমন : ‘আমেরিকা’, ‘দা ট্রায়াল’ও ব্যক্তি-মানুষের অসহায় উন্মূলতা, বিচ্ছিন্নতা, অস্তিত্বের উদ্বেগ, অপরাধবোধ এবং অযৌক্তিকতার বিষয়গুলো অকপটভাবে তুলে ধরে। কাফকার লেখায় বাস্তবতা ও পরাবাস্তবতার চমৎকার মিশেল দেখি। লাতিন আমেরিকান জাদুবাস্তবতার পথতো তিনিই দেখিয়েছেন। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস লিখেছেন, ‘মেটামরফোসিস তাকে শিখিয়েছে কীভাবে ভিন্নভাবেও বর্ণনা করা সম্ভব’।


‘মেটামরফোসিস’ নভেলার শুরু নাটকীয়ভাবে—এক সকালে কেরানি ছোকরা গ্রেগর আবিষ্কার করে সে তো আর মানুষ নয়—প্রকাণ্ড এক পোকা। সবাই গ্রেগরের সময়নিষ্ঠতা, দায়িত্ব সচেতনতা এবং অফিসগামী চেহারার সঙ্গে অভ্যস্ত। কিন্তু এই সকালে কী হলো এমন? গ্রেগর কোনোদিন এই পরিবার ছাড়া কিছু ভাবেনি—ওর আদরের বোন, প্রিয় বাবা-মা—সবার কথা ওর মনে হয়েছে। কিন্তু পোকায় রূপান্তরের পর তার জগৎ পাল্টে গেলো। কেউ তাকে মনে রাখলো না। প্রথমে সে রূপান্তরটিকে অস্থায়ী মনে করে এবং পরে আস্তে আস্তে এই রূপান্তরটির পরিণতিগুলি বিবেচনা করে। গ্রেগর তার ম্যানেজার এবং তার পরিবার, উভয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে, তবে তারা দরজার পেছন থেকে যা কিছু শুনতে পায়, তা বুঝতে পারে না। গ্রেগর অনেক কষ্টে নিজেকে মেঝের উপর দিয়ে টেনে নিয়ে যায় এবং দরজা খোলায়। পোকায় রূপান্তরিত গ্রেগর নিজেকে স্থানান্তরিত করার চেষ্টা করার সময় দেখতে পায় যে, তার অফিসের ম্যানেজার, প্রধান কেরানি, গ্রেগরের অনিচ্ছাকৃত অনুপস্থিতি সম্পর্কে ক্ষিপ্ত হয়ে তার উপর নজরদারি করতে এসে গেছে। এতেই সে বুঝতে পারে, সে এক ত্রাসের পৃথিবীতে পেঁছে গেছে।

Comment As:

Comment (0)