ছোটগল্পের সাহিত্য

A+ A- No icon

গল্প আসে তিনটি ক্ষেত্র থেকে : এক. মানুষের কৌতূহল; দুই. অভিজ্ঞতা; তিন. কল্পনা। কৌতূহলে, অভিজ্ঞতায়, কল্পনায় মেশামেশির ফলে, পারস্পরিক মৈত্রী ও দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে গল্প বেরিয়ে এসেছে। এবং গল্প আবার আবেদন জানিয়েছে শ্রোতার কৌতূহল, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার কাছেই।


কৌতূহল মানুষের আদিমতম প্রবৃত্তিগুলোর একটি। এবং সবচেয়ে শক্তিশালী প্রবৃত্তিও বটে। ঔপন্যাসিক ই এম ফরস্টার। তাঁর ছোট্ট, চমৎকার বই আসপেক্টস অব দি নভেল-এ কৌতূহলের শক্তি ও মূল্যের বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। সেই যে প্রাচীন “আরব্য রজনী”র এক হাজার এক রাত্রির গল্পগুলো তাদের বর্ণনার কাঠামোটি স্মরণ করিয়ে দিয়ে ঔপন্যাসিক-সমালোচক বলছেন যে শাহেরজাদীর পক্ষে গল্পের ভেতর দিয়ে ‘রক্তপিপাসু’ শাহজাদার কৌতূহল জাগিয়ে তোলা এবং জাগিয়ে রাখাটা খুবই জরুরি ছিল। আসলে জীবন-মরণ সমস্যা ছিল ব্যাপারটা। রাজপুত্রের নিয়ম ছিল প্রতিদিন একজন করে কুমারীকে বিয়ে করবেন, এবং রাত পোহাবার আগেই হত্যা করবেন সেই স্ত্রীকে। শাহেরজাদীরও নিহত হবার কথা ছিল- রাত পোহালে। বাঁচার জন্য গল্প বলা শুরু করলেন তিনি। গল্প বলতে বলতে রাত পুরিয়ে যায় কিন্তু গল্প শেষ হয় না। তাই গল্পের খাতিরে বাঁচিয়ে রাখতেই হয় ওই কন্যাকে। পরের রাতে আরেক গল্প। রাত পোহায়, গল্পের কিছুটা বাকি থাকে। তারপর? তারপর কি হলো? কি ঘটল? জানবার যে ভীষণ কৌতূহল সৃষ্টি হয় শাহজাদার মনে সেই কৌতূহলই বাঁচিয়ে দেয় শাহেরজাদীকে। কৌতূহল সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হলে জীবন দিয়ে মেটাতে হতো দাম। এমনই কঠিন পরীক্ষা তাঁর। এই পরীক্ষায় সকল গল্পকারকেই নামতে হয়। কৌতূহল সৃষ্টি করতে হয় শ্রোতার মনে। ব্যর্থতা অর্থ মৃত্যু; গল্পকার হিসেবে আর বেঁচেই থাকবেন না যদি-না শ্রোতার মনে আগ্রহ থাকে ওই গল্প শোনার। প্রত্যেক গল্পকারই তাই একজন শাহেরজাদী।


আদিম মানুষেরও কৌতূহল ছিল। সে তার জানা জগৎটাকে দেখেছে। প্রতিদিনের পরিচিত জীবন সম্বন্ধে একটা অভিজ্ঞতা সৃষ্টি হয়েছে তার মনে। কিন্তু তাতে সন্তুষ্ট হয় নি। এর বাইরে কি আছে জানতে চেয়েছে সে। কি আছে ঐ পাহাড়ের ওপাশে? কারা থাকে ঐ সমুদ্র পার হলে যে দিগন্ত সেই দিগন্তের পারে? কেমন তাদের ্‌ আচার-আচরণ, কেমন তাদের ঘর? মরলে পরে মানুষ কোথায় যায় চলে? প্রতিদিন সূর্য ওঠে, প্রতিদিন আবার যায় অস্ত। কোথায় থাকে সে উদয়ের পূর্বে, অস্তের পরে? এসব নানা বিষয়ে নানা রকম জিজ্ঞাসা তার মনে। এসব কৌতূহলের নিবৃত্তি চায় সে।
ওদিকে আবার সব মানুষের সমান কল্পনাশক্তি থাকে না। যাদের কল্পনা করবার শক্তি বেশি তারা এইসব কৌতূহলের পথ ধরে, অভিজ্ঞতার কিছু সঞ্চয় সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যায় অনেক দূর। সৃষ্টি করে গল্পের। একেকটি গল্পের ভেতর ধরা দেয় কৌতূহল, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার একেক রকম সংমিশ্রণ।


শুরুতে মানুষের অভিজ্ঞতা ছিল কম। কৌতূহল ছিল বেশি। কল্পনাও ছিল অধিক শক্তিশালী। তখনো বিজ্ঞান আসে নি। বিজ্ঞানের একটা বড় কাজ বস্তুজগতের ব্যাখ্যা দেওয়া। বিজ্ঞানে যে কল্পনা নেই এমন অলক্ষুণে কথা কেউ বলবেন না। কিন্তু বিজ্ঞানকে চলতে হয় যুক্তির শাসনে। বিজ্ঞান তাই বুদ্ধিজীবী। তাই তার সাহস কম, পদে পদে ধীরে ধীরে চলে, বিচার ও বিশ্লেষণের সমর্থন ছাড়া এগোয় নাই। বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কল্পনা বুদ্ধির দ্বারা শাসিত। বিজ্ঞান আসার আগে বিজ্ঞানের কাজটার দায়িত্ব কল্পনাকেই নিতে হয়েছে। বিষয় ও বস্তুর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কল্পনা পরিচয় দিয়েছে দুঃসাহসের। সৃষ্টি করেছে সে অতিকথার (যার ইংরেজি নাম হলো মিথ); চাঁদকে নিয়ে সে সূর্যের বোনের গল্প খাড়া করেছে। অথবা কল্পনা করেছে চাঁদে আছে এক বুড়ি, চাঁদে তার অনেক কাজ। শীত কেন আসে? তার ব্যাখ্যা অতিকথা দিয়েছে। গ্রীষ্মে কেন গরম হয়? তার ব্যাখ্যাও পাওয়া যাবে অতিকথায়। পৃথিবী কোত্থেকে এলো? স্বর্গ জিনিসটা কেমন? সবকিছুর ব্যাখ্যা অতিকথায় পাওয়া যাবে। অতিকথা অতিশয় সরল। সভ্যতার শৈশবে অভ্যুদয় তার। শৈশবের প্রাণবন্ততা আছে তার ভেতর।


অতিকথার মতোই, কিন্তু কিছুটা ভিন্ন ধরনের গল্প হলো রূপকথা। সেখানেও ভরটা অভিজ্ঞতার জগতের ওপরেই, কিন্তু অভিজ্ঞতার জগৎকে ছাড়িয়ে, কৌতূহলের প্রেরণা নিজের মধ্যে ধরে নিয়ে, গল্প চলে গেছে আকাশে, বন-বাদাড়ে, পাহাড়ের চূড়ায়, সমুদ্রের গভীরে। রূপকথায় ভালো আছে, মন্দ আছে। একদিকে আছে রাজপুত্র ও রাজকন্যা; অন্যদিকে, তাদের বিপরীতে, সর্বদাই হুঙ্কার দিচ্ছে, দাঁত ঘষছে, ফন্দি আঁটছে আরেক দল- দৈত্য তারা, কখনো বা রাক্ষস। দুয়ের মধ্যে ভীষণ লড়াই। হয় বেঁধে গেছে, নয় তো এই বাঁধল বলে। এই লড়াইয়ে জিতবে কে? ভালো জিতবে, মন্দ যাবে হেরে। জিততেই হবে ভালোকে- শেষ পর্যন্ত। আমরা সবাই যে ভালোর পক্ষে। ভালো যে লড়ছে আমাদের সকলের হয়ে, আমাদের শুভেচ্ছা ও উৎকণ্ঠা সঙ্গে আছে তার।


রূপকথার জগৎটা অতিরঞ্জিত, মাধ্যাকর্ষণবিরহিত। কিন্তু তার অন্তর্গত ‘ভালো’র জন্ম মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ থেকেই। অভিজ্ঞতা কি বলে না একথা যে পৃথিবীতে সুখ কেবলই আক্রান্ত হচ্ছে দুঃখ দ্বারা? সুখ-দুঃখের এই অভিজ্ঞতা থেকেই ভালো বেরিয়ে এল। এল রাজপুত্র, এল রাজকন্যা। তারা অন্য কেউ নয়, প্রতিদিনের দেখা শুভেরই কল্পিত মূর্তি। অন্যদিকে দৈত্য-দানব, রাক্ষস-ক্ষোকস এদের আগমন কোথা থেকে? ঠিকানাটা কি? এরাও এসেছে ওই যে মানুষের অভিজ্ঞতার জগৎ সেখান থেকেই। ঘৃণা ও ভয় মিলেই উদ্ভব এসব কিম্ভূত, উদ্ভট, উৎকট প্রাণীর। রাজকন্যা বন্দী হয়েছে রাক্ষসের হাতে। এ ঘটনা কিসের কথা বলে? বলে মানুষের নিরাপত্তাহীনতার কথা, বলে অশুভের নির্মমতার কথা। রাজকন্যাকে এখন উদ্ধার করবে কে? উদ্ধার করবে রাজপুত্র- যে আমাদের ইচ্ছাপূরণ, আমাদের শেষ ভরসা।


গল্প যদিও অতিকথা এবং রূপকথা, উভয়েই, তবু অতিকথা ও রূপকথার ভেতর একটা ব্যবধান আছে। সেটি এইখানে যে, অতিকথা বিষয়ের ও বস্তুর ব্যাখ্যা দেয়, রূপকথার সে দায়িত্বটা নেয় না, রূপকথায় একটা নীতিবোধ থাকে, তাই বলে রূপকথা কিন্তু নীতিকথা নয়। নীতিকথাও এসেছে এক সময়ে। যেমন ধরা যাক, ঈশপের গল্পগুলো। সুন্দর গল্প, পরিচিত অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করেই তৈরি; কিন্তু গল্পের শেষে একটি নীতিকথা আছে যে নীতিকথাটা বাদ দিলে গল্পটা দাঁড়িয়ে থাকে না, ভেঙে পড়ে যায়। কিন্তু গল্পের জন্যও গল্প আছে। যেসব গল্প রূপকথার মতো দুঃসাহসী নয়, অতিকথার মতো ব্যাখ্যা দেবার দায় নেই যার কাঁধে, নীতিকথার বোঝাও নেয়নি যে আগবেড়ে- এই ধরনের গল্পকে বলা যায় আখ্যান বা উপাখ্যান। আরব্যোপন্যাসের গল্পগুলো যার চমৎকার নিদর্শন।


এভাবে অতিকথা থেকে শুরু করে নানান ধরনের গল্প এল মানুষের কাছে। উৎস ওই কৌতূহল, অভিজ্ঞতা ও কল্পনা। গল্পের ধরনগুলো সবদেশেই প্রায় একই রকম। সভ্যতার বিশেষ বিশেষ স্তরে বিশেষ বিশেষ ধরনের গল্প রচিত হবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এরই মধ্যে যাকে বলে স্থানীয় রঙ সেটা এসে লেগেছে। ফলে এক ধরনের হয়েও গল্পগুলো হুবহু এক রকমের হয়নি। দেশে দেশে তার রকমফের।
ছোটগল্প এসেছে অনেক, অনেক পরে। ছোটগল্প একটি সাহিত্যিক রূপকল্প। সাহিত্যের ব্যাপার সে। মুখে মুখে বলা গল্প থেকে অনেক দিক দিয়েই স্বতন্ত্র। তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ দিন। প্রথমে কবিতা এল, তারপর নাটক, আরো পরে গদ্য, গদ্যের সূত্র ধরে প্রবন্ধ, তারপর উপন্যাস। উপন্যাসেরও পরে এসেছে ছোটগল্প। বলা হয়ে থাকে ছোটগল্প ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যাপার।


এক দিক দিয়ে ব্যাপারটা বিস্ময়কর। গল্পের শুরু সবার আগে, ছোটগল্পের শুরু সবার পরে। কারণ কি? কারণ আর কিছুই নয়, কারণ হচ্ছে গল্পের সঙ্গে ছোটগল্পের দূরত্ব। সেই দূরত্বটা পার হতে লেগে গেছে কয়েক শতাব্দী। এই দূরত্বটা কয়েকটি উপাদান দিয়ে গঠিত। প্রথমে ধরা যাক ভাষার কথা। সব গল্পেই ভাষা দরকার। কথক মাত্রেই ভাষা-শিল্পী। কিন্তু ছোটগল্পের ভাষা বিশেষ ধরনের ভাষা। গল্প কিন্তু কবিতাতেও বলা চলে, লেখাও চলে। এককালে কবিতা গল্প বলত বৈকি। কিন্তু কবিতার গল্প কখনোই ছোটগল্প হবে না। ছোটগল্প অবশ্যই গদ্যে লেখা। আর আমরা তো জানিই যে সব দেশের সাহিত্যেই কবিতা এসেছে প্রথমে, গদ্য এসেছে কবিতার কাজ যখন একটা বিশেষ পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে এবং সাহিত্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে এমন সব অভিনব সামাজিক দায়িত্ব পালনের দায় কবিতার পক্ষে যা পালন করা আর সম্ভব নয় সেই- অনিবার্যরূপে- আবির্ভাব হয়েছে গদ্যের। গদ্য উন্নততর সামাজিকতার অর্থাৎ সামাজিক আদান-প্রদানের, ভাব ও তথ্য বিনিময়ের ভাষা। মানুষের সভ্যতা যখন একটি বিশেষ স্তরে এসে পৌঁছেছে, তার বুদ্ধিবৃত্তি তীক্ষ্ম হয়ে উঠেছে সামাজিকতার ভিত্তিতে, সমাজের বন্ধন একটা সুস্পষ্ট রূপ নিয়েছে গদ্য তখনকার গণ-মাধ্যম।


গদ্য সামাজিক সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যেরও প্রতিভূ বটে। বহু বিচিত্র কাজ করে গদ্য। প্রবন্ধ লেখে, লেখে উপন্যাস। প্রবন্ধের গদ্যের সঙ্গে উপন্যাসের গদ্যের ব্যবধান স্বভাবতই বিস্তর। প্রবন্ধের ভাষার মধ্যে প্রবণতা থাকে বৈজ্ঞানিক হয়ে উঠবার। অর্থাৎ একেবারে স্পষ্ট, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ হয়ে পড়বার। ভাষা যখন বৈজ্ঞানিক হয় তখন তাতে কোনো রহস্যময়তা থাকে না, থাকে না দ্ব্যর্থতার সুযোগ। সেখানে লেখক জানেন কি তিনি বলতে চান, পাঠকও বোঝেন কি বলা হয়েছে। ভাষা সেখানে বক্তব্যের পোশাক মাত্র, বক্তব্যের অংশ নয়। এটি হচ্ছে গদ্যের আদর্শ রূপ, তবে গদ্যের সাহিত্যিক রূপও রয়েছে; যেখানে কিছুটা রহস্য রয়েই যায়।


উপন্যাসের গদ্যে ব্যাপারটা ভিন্ন ধরনের। সে গদ্যও গদ্য বটে, কবিতা নয়; কিন্তু তার মধ্যে কবিতার গুণ কিছু কিছু থেকেই যায়। কবিতার গুণ কি? প্রধান গুণ কল্পনাকে ধারণ করা। বিজ্ঞানের ভাষাতে কল্পনার ব্যবহার ঘটে যদি তবে তা গুণ নয়, বিড়ম্বনাই। অন্যদিকে উপন্যাসের ভাষায় কল্পনা থাকবেই, কেননা উপন্যাসতো কল্পনারই সৃষ্টি। কৌতূহল বিজ্ঞানেও আছে, যেমন আছে উপন্যাসে; কিন্তু বৈজ্ঞানিক কৌতূহলে যুক্তির পথ ধরে চলে, ঔপন্যাসিক কৌতূহল যুক্তিকে অমান্য করে না কিন্তু কল্পনাকে মুরব্বি মানে। উপন্যাসে অভিজ্ঞতা পুনর্নিমিত হয়, পুনর্মূল্যায়িত হয় কল্পনার দ্বারা। চেনা জগত নতুন হয়ে ওঠে। এই যে কল্পনা, ভাষার মধ্যে তাকে চিনব কি করে? চিনব ভাষায় ব্যবহৃত উপমা দিয়ে, উৎপ্রেক্ষার সাহায্যে। কল্পনায়-ধনী ভাষা অবশ্যই চিত্রবহুল।

 

এই চিত্রবহুলতা সৃষ্টি করে বিশেষ ধরনের আবেদন, লেখকের মনের ভাব সে স্পষ্ট করে বটে, কিন্তু সব বলার পরেও কিছুটা না-বলা থেকে যায়। এটা ছবির বৈশিষ্ট্য। একেক সময়ে একেক আলোকে একই ছবি ভিন্ন ভিন্ন হয়। ছবি বদলায় দর্শকের রুচিভেদে, দৃষ্টিশক্তির হ্রাস-বৃদ্ধিতে, অবস্থানের উঁচু বা নীচুতে। এজন্য দেখা যায় যে কবিতার অর্থ কখনো পরিপূর্ণরূপে পাই না আমরা, কবিতাতে ভাষা ভাবের পোশাক নয়,  ভাবেরই অংশ সে, কবিতার ভাষায় রহস্যময়তা থাকে, যার দরুন তার অর্থ একই কবিতা ভিন্ন ভিন্ন পাঠে কিছুটা হলেও বদলে যায়। কাব্যভাষার দ্বিতীয় গুণ যাকে বলে সুষমা। গদ্যের ভাষাকে যথাযথ হলেই চলে, কবিতার ভাষাকে সুন্দর হতে হয়। কেননা কবিতা সব সময়েই সাজানো-গোছানা, কিছুটা কৃত্রিম। কল্পনা তাকে প্রাণবন্ত করে, আর সুষমা তাকে সুন্দর, আকর্ষণীয়, মনমোহন করে তোলে।


উপন্যাসের সাহিত্যিক ভাষায় কাব্যভাষার এই দুটো গুণকে রহস্যময়তা ও সৌন্দর্যকে কিছু পরিমাণে হলেও থাকতেই হয়। কেননা উপন্যাসও সৃজনশীল কল্পনারই সৃষ্টি। সে বৈজ্ঞানিক নয়, সাহিত্যিক। উপন্যাসে কল্পনা কাজে লাগে আরো এক ভাবে। বিজ্ঞানের মতো উপন্যাসও আবিষ্কার করে, তার আবিষ্কারের ক্ষেত্রটা হচ্ছে মানুষের মন। মানুষের মনের ভেতর যে একটা অত্যন্ত সুন্দর, ভীষণভাবে রহস্যময়, নানা কারণে দুর্জ্ঞেয় জগৎ আছে সেই সত্যের স্বীকৃতির উপরই কথাসাহিত্যের ভিত্তি। এই বিশেষ জগৎ সম্পর্কে কথা-সাহিত্য এমন সব সত্য আবিষ্কার করে যা অন্যের পক্ষে যা করা সম্ভব নয়, করা সম্ভব নয় বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের পক্ষেও নয়, সম্ভব কেবল কল্পনার পক্ষেই। কল্পনাই পারে রহস্যের এই অস্পষ্টলোকে প্রবেশ করতে, সেখানকার সত্যগুলোকে খুঁজে বার করে আনতে। অর্থাৎ আবিষ্কারেও কল্পনা, প্রকাশেও কল্পনা।

 

যাকে আমরা উপন্যাসের ভাষা বলছি তারই একটি পরবর্তী ও পরিণত রূপ হচ্ছে ছোটগল্পের ভাষা। কবিতার ভাষা থেকে যেমন উপন্যাসের ভাষা বেরিয়ে এসেছে, উপন্যাসের ভাষা তেমনি জন্ম দিয়েছে ছোটগল্পের ভাষার। এ ভাষার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া তো গত্যন্তর ছিল না।

Comment As:

Comment (0)