নিথর স্বপ্ন

A+ A- No icon

শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদেলা পরিবেশ। কর্ণফুলী নদীর তীরে অভয়মিত্র ঘাট। পাশের বিশাল পথধরে মাঝে মাঝে কয়েকটা গাড়ী ছুটছে। নদীতে ভাসছে ছোট ছোট জাহাজ আর নৌকা। এখান থেকে অস্তমিত সূর্যটা ভারি সুন্দর দেখায়। গোলাপী থেকে আস্তে আস্তে লাল আভা ছড়িয়ে টুপ করে সূর্যটা দিগন্তের ওপাশে পানিতে ডুব দেয়। জাহিদ অভয়মিত্রঘাটের ব্রীজটার রেলিঙে দু’হাতের কনুইয়ে শরীরের ভর রেখে দিগন্তের দিকেই তাকিয়ে ছিল। কিন্তু প্রকৃতির এত অপরুপ পরিবেশেও তার ভাল লাগছিল না। শূন্যতা অনুভব করছিল। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বিগত তিন বছরে জাহিদ এই প্রথম একা বেরিয়েছে। প্রথম বর্ষ থেকেই মাহমুদ তার বন্ধু । আজ সে নেই।


জাহিদ ও মাহমুদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের মেধাবী ছাত্র। ওরিয়েন্টশন ক্লাসেই তাদের পরিচয় ও বন্ধুত্ব। দু’জনেই থাকে আলাওল হলের ২০৩ নং রুমে। বিভাগের পরিচিত মুখ জাহিদ ও মাহমুদ। মেধাবী হিসেবে তাদের পরিচিতি সর্বত্র। তৃতীয় বর্ষ পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছে মাহমুদ। আর জাহিদ প্রথম শ্রেণিতে পঞ্চম। জাহিদের গ্রামের বাড়ী যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার চৌগাছা গ্রামে। সে প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর পরই তার মা মারা যান। বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে সংসার করছেন। মা মারা যাওয়ার পর গ্রামের বাড়ীতে তেমন যাওয়া হয় না। অন্যদিকে মাহমুদের বাড়ী কক্সবাজার সদরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শীতকালীন ছুটির আগে এক বিকেলে জাহিদ মন খারাপ করে রুমে শুয়ে আছে। অন্যান্যদিন সে বিকেলে হলের মাঠে খেলতে যায়। খেলা শেষে বিকেলের নাস্তা সেরে রুমে এসে পড়তে বসে। 

 

মাহমুদ জাহিদের এই অবস্থা দেখে জিজ্ঞেস করল: “কীরে জাহিদ মাঠে যাবি না?” নারে দোস্ত ভালো লাগছে না। কেন? কী হয়েছে? না, কিছু না, যাব না আজ ঘুমাব। বলিস কী! বিকেলে ঘুমায় নাকি! আর তোর তো এই অভ্যাসও নেই। জাহিদ তুই না বললেও আমি বুঝতে পারছি, কোনো বিষয় নিয়ে টেনশন করছিস এবং আমার কাছে লুকাচ্ছিস! না. না..! নানা ডাকলে হবে না, সত্যি করে বল্‌ কী সমস্যা? আর না হয় বোঝবো আমি তোর বন্ধু না। আরে তুই এতো সিরিয়াস হচ্ছিস কেন? বলছি শোন্‌ ….ভাবছি এবারের বন্ধে বাড়ী যাব না। বিশ্ববিদ্যালয়েই ছুটি কাটিয়ে দিব। এটা নিয়েই ভাবছিলাম। বাড়ীতে গিয়ে কী করব বল্‌ ? মা’র কবর দেখলে আমি স্থির থাকতে পারি না। তাই ভাবছি হা … হা .. হা .. অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো মাহমুদ।এভাবে হাসছিস কেন?


হাসবো না! এই বিষয়ে আমি অনেক আগেই ভেবেছি। এই বন্ধে তোকে আমাদের বাড়ীতে নিয়ে যাব। কঙবাজারতো কোনদিন যাসনি। এবার তোকে নিয়ে ঘোরব। কাল মা’র সাথে যখন ফোনে কথা বলেছিলাম মাও বলে দিয়েছেন তোকে নিয়ে যেতে। চমকে দেওয়ার জন্যে তোকে বলিনি। উঠ্‌ এবার উঠ্‌। মাহমুদের বাড়ী কঙবাজার সদরের নুর পাড়া গ্রামে। তার বাবা মোবাশ্বেরুল হক চৌধুরী স্থানীয় ব্যবসায়ী। মা এবং ছোটবোন মুমতাহিনাকে নিয়ে ছোট্ট সুখের সংসার। মাহমুদ যখন দশম শ্রেণিতে পড়ে তখন হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মোবাশ্বেরুল হক চৌধুরী মারা যান। চৌধুরী সাহেবের মৃত্যু সবকিছু এলোমেলো করে দেয়।


মা আয়েশা সুলতানা একজন শিক্ষিত ও ধার্মিক মহিলা। তখন থেকেই সংসারের হাল ধরেছেন তিনি। প্রাইমারী স্কুলের চাকরির পাশাপাশি স্বামীর রেখে যাওয়া জমি-জমা ও মার্কেটের কয়েকটি দোকান ভাড়া দিয়ে সংসার চালান। সন্তানদের বাবার অভাব বোঝতে দেননি কখনো। আয়েশা সুলতানার স্বপ্ন মাহমুদ পড়ালেখা করে বড় কর্মকর্তা হবে। সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। কেনই বা স্বপ্ন দেখবে না! মাহমুদই তাঁকে স্বপ্ন জুগিয়েছে। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তির পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন এ + পেয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হয়েছে। মাহমুদের কাছে জাহিদের কথা অনেক শুনেছেন আয়েশা সুলতানা। এবার মাহমুদকে বলেই দিয়েছেন শীতকালীন ছুটিতে জাহিদকে সঙ্গে নিয়ে আসতে।


মাহমুদ বাড়ীতে আসার সময় মুমতাহিনার জন্যে একটি ল্যাপটপ এনেছে। সে ছোটবোনকে কথা দিয়েছিল মুমতাহিনা যদি এসএসসি তে গোল্ডেন এ + পায় তবে তাকে ল্যাপটপ উপহার দিবে। মুমতাহিনা গোল্ডেন এ + পেয়ে কঙবাজার সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়েছে। আজ ল্যাপটপ পেয়ে সে মহাখুশি। এই প্রথম জাহিদের কক্সবাজার ভ্রমণ। সে উচ্ছ্বসিত। হিমছড়ি, ইনানি, রামু, কক্সবাজার শহর ও সৈকত তাকে মুগ্ধ করেছে। সবথেকে মুগ্ধ হয়েছে মাহমুদের মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা। আয়েশা সুলতানার আদর আপ্যায়ন দেখে তার মা’কে মনে পড়ছিল। এ যেন হারানো মা’কে খুঁজে পেয়েছে। সামুদ্রিক মাছ, শুটকি, দেশি মুরগি, শীত পিঠা, খেজুরের রস সহ কত্তো সুস্বাদু খাবার খাইয়েছেন।


মা তাদের অনেক উপদেশ দিয়েছেন। সবচেয়ে যে কথাটি তার মনে দাগ কেটেছে তা হলো, “ তুমি মাহমুদের বন্ধু নও, মাহমুদের ভাই। আজ থেকে মনে করব আমার ২ ছেলে ১ মেয়ে। ভাইয়ের মত একে অপরের পাশে থাকবে। আশা করি দু’জনে ভালো ফলাফল করে বিসিএস ক্যাডার হবে। আমি মাহমুদকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখি। দু’জনে আমার স্বপ্নকে পূরণ করবে। বলতে বলতে মা’য়ের চোখ দু’টি অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল। মাহমুদ বাড়ী থেকে ফেরার সময় পেছন ফিরে তাকাতে পারে না। মা এবং ছোট বোনের অশ্রুভেজা চোখ সহ্য করতে পারে না। বিদায় বেলা দৃষ্টির আড়াল না হওয়া পর্যন্ত মা এবং ছোট বোন দাঁড়িয়ে থাকে। আজও বোবা কান্না হজম করে জাহিদকে তাড়া দিচ্ছে। জাহিদের চোখও টলমল করছে। গাড়িতে যেতে যেতে মা ও বোনের মুখটি বারবার ভেসে উঠছে। গাড়ী চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে চলতে শুরু করল।


ভোরের শান্ত নির্মল প্রকৃতি। হাওয়া যেন স্থির হয়ে আছে। চারদিকে শীত শীত আবহাওয়া। এরই মাঝে পাখিরা নিজস্ব ভাষায় গান গাইতে শুরু করেছে। মাহমুদ ঘুম থেকে উঠে জাহিদকেও জাগিয়ে দিল। আজ দুটো ক্লাস টেস্ট আছে। তাই ফ্রেশ হয়ে ফজরের নামাযের পর পড়তে বসল। পরীক্ষা ভালোই হল। পরীক্ষার পর দুটো এঙট্রা ক্লাস আছে। মাহমুদের ভালো লাগছে না। কেমন অস্থির অস্থির লাগছে। জাহিদকে বললো.. চল্‌ ক্লাস করবো না। কেন? ভালো লাগছে না! চল্‌ শহীদ মিনারের দিকে গিয়ে বসি। দু’জনেই শহীদ মিনারের সিঁড়িতে বসে গল্প করছে। কিছুক্ষণ পর কাটা পাহাড়ের দিক থেকে একটি মিছিল শহীদ মিনারের দিকে আসতে লাগল।


ইদানীং ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি অস্থির হয়ে উঠেছে। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই ছাত্র সংগঠনের মধ্যে তুচ্ছ বিষয়েই সংঘর্ষ ও মারামারি লেগেই থাকে। মাহমুদ ও জাহিদ মেধাবী হওয়াতে অনেকেই দলে বেড়াতে চেয়েছিল কিন্তু পুঁজিবাদী লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি তাদের অপছন্দ। তাই কোন ছাত্র সংগঠনেই যোগদান করেনি। মিছিল দেখে জাহিদ বলল .. চল্‌ অন্যদিকে বসি। মাহমুদ বলল.. কিচ্ছু হবে না, এখানেই বস্‌… উল্টোদিক থেকে প্রতিপক্ষ সংগঠনের আরেকটি মিছিল এদিকেই আসছে! দু’টো মিছিলই প্রায় একই সময়ে শহীদ মিনারের সামনের রাস্তা অতিক্রম করার সময় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল!! কিছু বোঝে উঠার আগেই সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল। আক্রমণ পাল্টা আক্রমণ জাহিদ দৌঁড়ে সামনের অগ্রণী ব্যাংকে আশ্রয় নিল। এরই মধ্যে কয়েকবার গুলির শব্দ শোনা গেল।


প্রায় ঘণ্টাব্যাপী চলতে থাকা সংঘর্ষ পুলিশ, র‌্যাব ও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে আসল। গুজব রটে গেল ৫/৬ জন নিহত হয়েছে! জাহিদ মাহমুদকে খুঁজতে লাগল, মাহমুদের মোবাইলে কল দিতেই অন্য প্রানেত অপরিচিত কণ্ঠ বলল, শহীদ মিনারের পাশে আসেন। দৌঁড়ে শহীদ মিনারের রাস্তায় এসে দেখল মানুষের জটলা। জটলা ঠেলে ভেতরে মুখ বাড়াতেই সারিবদ্ধভাবে রাখা ৩টি লাশের দিকে চেয়ে বোবা হয়ে গেল জাহিদ! যেন ঠোঁট নাড়ার শক্তিও হারিয়ে ফেলল। বসে পড়ে হাউ মাউ করে কাঁদতে লাগল।


সেদিনের ঘটনা মনে পড়লে নিজেকে বড় অপরাধী মনে হয়। চোখের সামনেই পৈশাচিক ঘটনা ঘটল অথচ সে কিছুই করতে পারল না। চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেল একটি ভবিষ্যত। কী দোষ ছিল তার! সে তো রাজনীতি করত না। স্বার্থান্বেষী রাজনীতির বলি হল এক সাধারণ ছাত্র। কী জবাব দিবে মাহমুদের অসহায় মা ও বোনকে! মাহমুদের নিথর রক্তাক্ত দেহ যেন শুধু নিথর শরীর নয়, মা ও বোনের নিথর স্বপ্ন।


জাহিদ এখন ক্যাম্পাসে থাকে না, শহরে একটি মেসে থাকে। ৪র্থ বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়েছে গতকাল। আজ অভয়মিত্রঘাটে বেড়াতে এসে শূন্যতা অনুভব করছিল। মাহমুদের কথা খুব মনে পড়ছে। হঠাৎ বাদাম বিক্রেতার ডাকে সম্বিত ফিরে পেল। বাদাম বিক্রেতার দিকে না তাকিয়ে হাতের ইশারায় জানিয়ে দিল খাবে না। হাউ মাউ করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। মাহমুদকে বাঁচাতে না পারার অপরাধ যেন চোখের পানিতে মুছে ফেলতে চায় জাহিদ। দিগন্তে তখন রক্তিম আভা। সূর্যটা প্রায় ডুবতে বসেছে নদীর পানিতে।

Comment As:

Comment (0)