উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে

A+ A- No icon

‘ফুলের বনে যার পাশে যাই তারে লাগে ভালো’, বা ‘গোলাপ বলে, ওগো বাতাস, প্রলাপ তোমার বুঝতে কে বা পারে’—এই এমন অসংখ্য যে-কথা বা আত্মলব্ধবোধ, এর মধ্যে কি শুধু মুগ্ধ-আর্তি প্রকাশ পেল, নাকি ব্যক্ত হলো কোনো পারাপারের আকাঙ্ক্ষা, যা স্বতশ্চল হতে চায় অবাধ মনশ্চারণায়! অথবা ‘চৈত্ররাতের চামেলি’র যে-রূপ মনে হয় প্রতিভাত, তা কি একান্তই অনুভব না কি তার কাছে যাবার এবং তাকে পাবার ব্যাকুলিত স্পৃহা! ফুল তুলতে বনে গিয়ে দু’নয়নে জল নিয়ে ফিরে আসা, বা রাতে বিছানায় শুয়ে মুখ ঢেকে অন্ধকারকে অনুভব করে কালো নদীর দু-ধারকে মনে করা আর তার ভেতর দিয়ে রাতের নৌকার চলাচলকে কল্পনা করা—এই যে আপাত কার্যকারণহীনতা, যা-ই হোক না কেন, এটা যে মনোভ্রমণ, এটা যে মনশ্চারণ তাতে কোনো জড়তা নেই। ভাব যখন মনকে নাড়ায়, সত্তা তখন ভ্রামণিক, আর ব্যক্তি তখন চিন্তা বা কল্পনারসে চিরপথিক। স্থিরতার মধ্যে এক অসম্ভব অস্থিরতা তাকে অবিরত এবং অনবরত দোল দিতে থাকে, কেননা জীবনের অন্বেষণ আর উদ্যাপন তো প্রথমে শুরু হয় মনের উসকানি এবং উহ্যমানতায়। মন—যা কবির সম্বল, মন—যা পথিকের চালনশক্তি, মন—যা সত্তার আলোর ঝলকানি।


আমরা যখন গান শুনি, বা কিছু পড়ি, বা লিখি, বা দেখি চিত্র বা শিল্পরূপ—তখন বস্তুত ভ্রমণ করতে থাকি, হই মনোভ্রামণিক। মুহূর্ত তখন মহাকাল হয়ে ওঠে, প্রতিটি অনুভূতির কম্প্রমাধুরি তখন গতি পায়, এগিয়ে চলে নিজ খেয়ালে। শিল্প বা চিন্তার মাঝে থাকা মানে এক ভ্রমণে থাকা, কেননা শিল্প আগাগোড়াই মনকে ভ্রমণে রাখে। শরীর ভ্রমণ করে না, মন করে, শরীর তাকে অনুসরণ করে সমর্থন দেয় কখনও কখনও; আবার শরীরের সমর্থন ছাড়াও মন ভ্রমণ করে, শরীর বিগড়ে গেলে কখনো-বা মন আরও দ্রুতগামী হয়ে ওঠে। মুহূর্তের মাঝে অসীমের আনাগোনা, সময়ের পল ধরে মনের অসম্ভব সঞ্চরমানতাকে টের পেতে থাকা তাই ভ্রামণিক সত্তার নিয়তি। বেরিয়ে আসে বোধিত দৃশ্য, স্ফুট হয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা। সুর-শব্দ-রূপের স্বগত পথরেখা ধরে এগোয় একা একা, যেন নিঃসঙ্গ পথিকের অভিযান। উতল মন উত্তাল হয় বায়ুপ্রবাহের মতো। ধীরে স্পষ্ট হয় পথিকের অন্তর্ভেদী জাদুঘর। পথিক সেই অনশ্বর ও অনন্ত জাদুঘরের বিস্ময়মানব, যে দেখে মন দিয়ে, হাঁটে সত্তার শাশ্বত পরিক্রমণে।


যৌবনের স্বপ্নতাড়িত রোমান্টিকতা থেকে বয়স্কের অস্তিত্বতাড়িত রোমান্টিকতা, বা যুবকের অস্তিত্বভাবনা থেকে প্রবীণের অস্তিত্বভাবনা, বা নবীন প্রেম থেকে প্রবীণ প্রেমের খেলা, খেয়া এবং পারাপার—সবই তার লেখায় উদ্ভাসিত, এমনভাবে যে তা অভিসন্ধিত বোধ ও অর্থময়তাকে হাজির করতে মহাতৎপর। সমগ্র জীবনের অবস্থান ও অন্বেষণে যেন তিনি কবিতা লিখেছেন, যা স্থানবদল করেও নিজ স্থানে ফিরে যায় বারবার। অর্ধস্বর বা অনুস্বর সৃষ্টি তার কবিতার অপ্রতিম বিশিষ্টতা। হয়তো পুরো কবিতা নয়, কেননা কবিতার সমগ্রতা একটি আপতিক বিষয়, তার অতলান্ত অর্ধস্বরগুলো—যা সচকিত এবং খনিতে হঠাৎ উঠে আসা উদ্ভাসিত হীরকখণ্ডের মতো দ্যুতিমান—এখনো কাঁপিয়ে দেয় মানুষের কবি-মনকে, যারা অন্তত শাশ্বতের পরিপ্রেক্ষিতে বিচার করতে চায় কবিতাকে। পৃথিবী, তার সমগ্রবোধ এ কথাই বলে যে, তিনি হলেন পৃথিবীর কবি। এ পৃথিবী যদি কবিতা পড়তে চায়, ঈশ্বর যদি কবিতা পড়তে চান, তবে পড়তে হবে তার কবিতা। ঈশ্বরের সৃষ্টিকে ভাব দিয়ে নতুন সৃষ্টি করেছেন তিনি, পাঠককেও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ‘তিনিও কবি’। সৃষ্টিকে ভাব দিয়ে ভূমা যদি দেখতে চায় নিজেকে, তবে নিজ প্রতিরূপ খুঁজে পাবে তার কবিতায়। সারাজীবন তিনি যেন এক নাছোড় স্মৃতিই নির্মাণ করেছেন, যে-স্মৃতি সাহিত্য-শিল্প-সংগীতে প্রতিধ্বনি তুলে চলেছে।

Comment As:

Comment (0)