আগুন ক্ষুধা

A+ A- No icon

লোকটা রাস্তায় বসে ছিল। বিয়েবাড়ির নকশা করা গেটের সাথে রাস্তায়। শহর আর মফস্বলের অনুষ্ঠানের বিয়ের অনেক পার্থক্য। বাড়ির উঠানে শামিয়ানা টানিয়ে খোলা আকাশের নিচে দিব্যি ভোজসভা বসে যায়। মিনারেল ওয়াটারের বদলে কাচের জগভর্তি পানি দেয়া হয় এখনো। বোরহানি, জর্দা, ফিরনি থাক বা না থাক, দই থাকতেই হবে। গেটের সামনে মাটিতে কাউকে বসে থাকতে হয় না। সবাই এখানে মেহমান। শুধু একটা লোকই রাস্তায় বসে থাকতে দেখে অবাক হলাম।

 

আমাদের আসলে দুইটা দাওয়াত ছিল একই সময়ে। তেল-চর্বির ছড়াছড়ি এড়িয়ে যেতে চাইলাম। তবুও বসতে হয় বলে বসে গেলাম খাওয়ার টেবিলে। আশপাশে সবাই গোগ্রাসে খাবার গিলছে। আমরা তিনজন ভাইয়া, ভাবি আর আমি পোলাও খুঁটিয়ে যাচ্ছি। ভাইয়ার কোলেস্টেরল বেশি ধরা পড়েছে। একটা মুরগির রোস্ট আর সালাদেই হাত চলছে তাই। আমার গরুতে অ্যালার্জি হয়। মেনু এমনিতেই কমে গেল। ভাবির ডায়েটিং চলছে। সালাদই একমাত্র সম্বল।

 

আমাদের পাশেই একটা লোক অনেকণ ধরে খাচ্ছে চোখেমুখে তৃপ্তি নিয়ে। আরেকটা টেবিলে মোটামতো একজন দুইটা ছোট ছেলে নিয়ে নিজের ছেলে হবে হয়তো একটু পরপর গরুর গোশতের কারি শেষ করে ফেলছে। গেটের বাইরের লোকটার সাথে আরেকটা ছোট ছেলে জুটেছে এতণে। টেবিলের অতিথিদের দিকে তাকাচ্ছে দুইজন বারবার।

 

‘আরে ভাই, কিছুই তো নিলেন না। শহরের মানুষ, গ্রামের খাওয়া একটু চেখে দেখেন না। ছোট ভাই একটু গরু নাও। দেশী গরু।’

‘আমি গরু খাই না। র‌্যাশ হয়।’ 

টেবিলে পাশে বসা লোকটার খাওয়া শেষ। টিউবওয়েলটা চেপে চেপে সাবানপানিতে হাত ধুচ্ছে। মোটামতো লোকটার ছেলেগুলো এখনো খাচ্ছে। আমি একটু এগিয়ে এলাম গেটের দিকে। রাস্তার লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বোকার মতো একটা হাসি দিলো। বয়স্ক একটা লোক। বয়স প্রায় সত্তর হবে। ময়লা সাদা পাঞ্জাবি আর সাদা টুপি, ময়লা গোঁফ-দাড়ির ফাঁক দিয়ে কয়েকটা দাঁত দেখাচ্ছে।

 

বিড়ি, পান-জর্দায় নোংরা কিছু দাঁত। কেন যেন মনে হলো ক্ষুধার্ত মানুষের হাসির মতো কষ্টের হাসি আর নেই। লোকটা হয়তো ভিন্ন গ্রামের। তাই হয়তো সব লজ্জা ফেলে একটু খাবারের জন্য কুকুরের মতো বসে আছে। সবার খাওয়া শেষ হবে, বেঁচে যাওয়া পোলাও এবং গোশত বাটিতে বাটিতে চলে যাবে বেয়াই বাড়ি কিংবা ফ্রিজে। তারপর উচ্ছিষ্ট কিছু হয়তো এ লোকটা পেলেও পেতে পারে। সারা দিনের মামলা। কিন্তু কিচ্ছু ঝুঁকি নেয়া যাবে না। পৃথিবীতে সব কিছু আগে এলে আগে পাবেন ভিত্তিতে চলে। 

 

তৃপ্তি নিয়ে খাওয়া লোকগুলো এখন পান চিবুচ্ছে। কেউ কেউ নারকেল পাতার শলাকা দিয়ে খুব বিশ্রীভাবে দাঁতের মাঝে লুকিয়ে থাকা গোশত বের করছে। আর পোলাও লবণাক্ত, মুরগিটা ফার্মের, গরু সেদ্ধ হয়নি, দই মিষ্টি না ইত্যাদি গবেষণা করছে। মনে হচ্ছে সমালোচনা করা এখানে নিন্দনীয় নয়, খুবই জরুরি একটা রীতি। মোটা লোকটার ছেলেগুলো এতণে দই হাতাচ্ছে।

 

একটু পরে হাত ধুয়ে ওরাও বলবে, খাওয়া ভালো হয়নি। রাস্তার বয়স্ক লোকটার ক্ষুধা এতণে আরো বেড়েছে মনে হয়। মুখের হাসি লেগে আছে এখনো। লোকটার দিকে কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না। আমি কি আমার আত্মীয়র কাছে গিয়ে বলব, চাচা লোকটা অনেকণ বসে আছে, একটু খাবার দেন। নাকি কুড়িটা টাকা হাতে দিয়ে বলব, মুরব্বি একটু চা-বিস্কুট খেয়ে আসেন, সন্ধ্যার আগে খাবার মিলবে না। খুব স্বাভাবিকভাবে আমি কিছুই করলাম না। শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে চলে এলাম।

 

হাড়গিলে লোকটার কোলেস্টেরল মনে হয় বেশি না। কোনো খাবারে অ্যালার্জিও নেই হয়তো। লবণ, তেল, চিনির কমবেশি হিসাবেই আনে না লোকটা। তার কোনো লজ্জা নেই, সময়ের কোনো কমতি নেই, কোনো কিছুতেই না নেই। লোকটার শুধু ছিল ক্ষুধা, পেটবোঝাই আগুন ক্ষুধা। তাই তার কোনো খাবার জুটল না

Comment As:

Comment (0)