কাকজীবন

A+ A- No icon

আজকাল খুব ভোরে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে টিয়ে পাখিটার। ক’দিন আগে খাঁচায় চড়ে বনানীর এই রাজকীয় বিউটি পার্লারের বারান্দায় ওঠার পর থেকেই সে লক্ষ করছে, রোজ ভোর হতে না হতেই চারপাশ থেকে কর্কশ কণ্ঠে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়ে যায়। কোত্থেকে যেন এতগুলো হত্তছাড়া কাক এসে পার্লারের সামনের রাস্তাটাতে জড়ো হয়, আর ডাকাডাকি করে পুরো এলাকাটা মাথায় তোলে।

 

টিয়েটার ভীষণ অস্বস্তি লাগে এই কাকদের কাণ্ডে। সে বিরক্ত হয়ে পড়ে ময়লাখেকো নীচুশ্রেণীর এই পাখিগুলোর ওপর। চারদিন হলো টিয়েটা শহরে ঢুকেছে। একটা নীল রঙের পিকআপ ভ্যানে নানা প্রজাতির একগাদা পাখির সাথে দূর মফস্বল থেকে নগরে আমদানি করা হয়েছে তাকে। মাত্র একদিন দোকানির পসরায় কাটানোর পরই বিক্রি হয়ে এসেছে সে, এই সুরম্য অট্টালিকায়। আসার পর থেকেই চলছে খানাপিনা।

 

যাকে বলে রাজকীয় ভোজ! বাপের জীবনে এমন বাহারি খাবারের স্বাদ পায়নি সে। খাঁচার ভেতরে রাখা আছে গোলাপি রঙের একটা ছোট্ট প্লাস্টিকের ট্রে। তাতেই সারাক্ষণ মজুদ করে রাখা হয় সুস্বাদু সব খাবার।  টিয়েটা পায়ের ওপর পা তুলে আরামসে দিন কাটাচ্ছে। শুধু কী তাই? রোজ রোজ পার্লারে আগত কয়েক শ’ সুন্দরী নারী মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। কথা বলে, সমীহ করে। আদরও করে খুব। টিয়েটা দেখতে বেশ সুশ্রী কি না। অহঙ্কারে মাটিতে পা পড়ে না তার।

 

রোজ রোজ কাকের বিশ্রী ডাকে ঘুম ভাঙার পর আয়েশ করে সূর্যোদয় দেখে সে। পার্লারের পিওন ছেলেটা সকালেই চলে আসে। প্রথমে সে ঘর ঝাড়– দেয়।  তারপর টিয়েটার খাঁচা পরিষ্কার করে। সারারাতে ত্যাগ করে রাখা মলমূত্র আর খাবারের উচ্ছিষ্টগুলো ঝেড়ে-মুছে তকতকে করে দেয় একদম। পিওনটাকে এ সময়ে নিজের চাকর ভাবতে টিয়েটার ভারি আরাম বোধ হয়! দেমাগে তার মন ভরে ওঠে।

 

পাখিটা আরো আগ্রহ নিয়ে লক্ষ করে, তার ফেলে দেয়া উচ্ছিষ্টগুলো খাওয়ার জন্য রাস্তার কাকগুলো কী রকম উন্মাদের মতো কাড়াকাড়ি হইহুল্লোড় শুরু করে দিয়েছে। আসলে কাক তো কাকই! দুনিয়ার নির্লজ্জ আর নীচু প্রাণী। টিয়েটা রঙিন অভিজাত খাঁচার ভেতর থেকে ঘাড় ফিরিয়ে অহঙ্কারী দৃষ্টি ফেলে কাকসমাজের দাপাদাপি দেখে আর মুখ টিপে হাসে।

 

এভাবেই দিন যায়। দুই দিন। ১০ দিন। ২০ দিন। তিন মাস। এ পর্যায়ে ভীষণ ব্যাকুল হয়ে ওঠে টিয়েটা। ওর খুব অস্তির বোধ হয়। ভীষণ। অসহ্য বন্দিত্ববোধে দম বন্ধ হয়ে আসে তার। দামি দামি সুস্বাদু খাবার, পার্লারের সাজুগুজু করা মেয়ে মানুষের মুগ্ধ চাহনি, মেকি আদর কিছুই আর ভালো লাগে না। বারান্দার বাইরে, রাস্তায় ডাস্টবিনে দাপিয়ে বেড়ানো কালো কালো নোঙরা কাকগুলোর দুরন্ত স্বাধীন জীবন দারুণভাবে টানতে থাকে তাকে।

 

গভীর ব্যাকুলতায় ডুবে থাকে পাখিটা। ওর মনটা ছটফট করতে থাকে। এমনকি নিজে এমন রাজকীয় বিলাসিতায় থাকা সত্ত্বেও কাকগুলোকে হিংসা করতে শুরু করে সে রীতিমতো। কী আশ্চর্য। টিয়েটা ভাবতে থাকে, কী আনন্দ এভাবে বেঁচে থাকায়? কী মর্যাদা নিজেকে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিষ্কার রঙিন খাঁচার ভেতর বসে থেকে অন্যদের দেখার, স্পর্শ করার, উপভোগ করে আনন্দ দেয়ার।

 

কী স্বার্থকতা আছে এই মিথ্যা আর মেকি আভিজাত্যবোধের অহঙ্কার ধরে রাখার? টিয়েটা ভেবে পায় না। সে ব্যাকুল হয়ে পড়ে। ব্যাকুল হয়ে ওঠে সাধারণ, সাদামাটা, ধুলায় ধূসর অথচ জমজমাট বেঁচে থাকার এক কাকজীবনের জন্য।

Comment As:

Comment (0)