রূপকথার মা

A+ A- No icon

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামবে নামবে ভাব। বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রিংকু। বাড়ির এই জায়গাটা ওর খুব প্রিয়। বাবা কয়েকটা গোলাপের চারা লাগিয়েছিলেন টবে। একটা গাছে ফুল ফুটেছে। সাদা রঙের গোলাপ। ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে ফুলটা। আজ মন ভালো নেই রিংকুর। ওর চোখের কোনায় ভোরের শিশিরের মতো বিন্দু বিন্দু পানি। ঝাপসা চোখে পাশের ফ্ল্যাটের দিকে আছে রিংকু।


দূর থেকে দেখা যাচ্ছে আবুলের মা আবুলকে আদর করছে। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খাচ্ছে। দৃশ্যটা দেখতে ওর ভালো লাগছে। অন্যদিকে বুকের ভেতর একটু চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছে রিংকু। কিন্তু কেন? আবুলের মা পাশের ফ্লাটের কাজের লোক। ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে আবুলের মায়ের বাসন মাজার শব্দ শুনে রিংকু। তারপর সন্ধ্যে পর্যন্ত তাকে দেখা যায় ওই বাড়িতে। আবুলের বয়স চার। ও সারাক্ষণ মায়ের আশপাশে ঘুরঘুর করে। মাঝেমধ্যে আবুলের কান্নার শব্দও পাওয়া যায়। আবুলের মা আদর করে ওকে থামানোর চেষ্টা করে। মাঝেমধ্যে খুব বেশি বিরক্ত হলে ধমক লাগায়।


আবুলেরও এক স্বভাব ধমক দিলেই চুপ মেরে যায়। আর কান্নাকাটি করে না। জিদ ধরে আরো জোরে জোরে চিৎকার করে না। মা ও ছেলের কোন কিছুই চোখ এড়িয়ে যায় না রিংকুর। কখনো কখনো মনের চোখ দিয়ে দেখে ওদের।  আবুলের ভেতর হয়তো নিজেকে দেখে রিংকু আর আবুলের মায়ের ভেতর নিজের মায়ের প্রতিচ্ছবি দেখে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আবুলের আদর খাওয়া দেখতে দেখতে নিজেকে খুব অসহায় লাগে রিংকুর। মায়ের আদর খেতে ইচ্ছে করে খুব। ভাবনার আকাশে ঘন মেঘ জমে। একবার মা যদি এসে ওর চুলগুলো এলোমেলো করে দিত। একবার যদি কপালে চুমু খেত। ভাবতে ভাবতে চোখে পানি এসে যায়। সবেমাত্র ক্লাস সিক্সের উঠেছে রিংকু।


সন্ধ্যের আগে আগের এই সময়টা বারান্দায় বসে থাকতে ওর ভালো লাগে। প্রায়ই আসে এখানে। কখনো-সখনো একটু হাঁটাহাঁটি করতেও ভালো লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যে বাবা ফিরবেন বাড়িতে। ওর বাবার নাম আরমান তালুকদার, বাংলাদেশ ব্যাংকে চাকরি করেন। অর্থনীতিতে পিএইচডি করেছেন তিনি। ব্যাংকের বড় পদে আছেন। অফিসের গাড়ি এসে নামিয়ে দিয়ে যায় বাড়ির গেইটে। সকাল আটটা নাগাদ বাবার সঙ্গে বের হয়ে যায় রিংকু। ওর স্কুলের কাছে নামিয়ে দেন বাবা। তারপর অফিসে যান তিনি। স্কুল ছুটি হলে একাই সিএনজিতে চড়ে বাসায় ফেরে রিংকু। এভাবেই প্রতিদিনের রুটিন। অনেক হিসেব-নিকেশের মধ্যে থাকতে হয় বাবাকে। তাই খুব একটা গল্প করা হয় না বাবার সঙ্গে। মাঝে মধ্যে ছুটির দিনগুলোতে বাবা ওকে নিয়ে ঘুরতে যায়। তখন মন খুলে গল্প করা হয় বাবার সঙ্গে। কিন্তু সব কিছুই কী বলা যায় বাবাকে!


রিংকুদের বাড়িতে থাকেন ওর বড় ফুপু কুলসুম। ফুপুই ওর সব। ফুপুর কাছেই রিংকুর বেড়ে ওঠা। তের বছর আগে রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান ওর ফুপা। ফুপা মারা যাওয়ার একবছর আগে সামান্য টাইফয়েড জ্বরে মারা যায় তাদের একমাত্র ছেলে জিসান। রিংকুর ফুপা মারা যাবার ছয় মাস পর জন্ম হয় রিংকুর। আর ওকে জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায় ওর মা শায়লা তালুকদার। তারপর ফুপু ওকে কোলে তুলে নেন। ফুপুই হয়ে যান রিংকুর মা। রিংকুকে অনেক আদর করেন তিনি। ফুপু কুলসুমকেই মা বলে ডাকে রিংকু। রিংকুদের ড্রইংরুমে ওর মায়ের বড় একটা ছবি টাঙানো। কি সুন্দর মমতা ভরা মুখটা, ঠিক যেন চাঁদের টুকরোর মতো। ওর মায়ের এই ছবিটার সঙ্গে ফুপুর মুখের অদ্ভুত মিল খুঁজে পায় রিংকু। ওকে ফুপু কখনো ‘আব্বু’ কখনো ‘আব্বা’ বলে ডাকেন।


আব্বা সকালের নাস্তা করে নেন, আব্বুটা দুষ্টুমি করে না। আমার আব্বুটা অনেক বড় ডাক্তার হবে। মানুষের মতো মানুষ হবে। এমন করেই বলে রিংকুর ফুপু। আবুলের আদর খাওয়া দেখতে দেখতে ওর চোখের সামনে একবার ফুফুর মুখ ভাসে, একবার ভাসে ছবিতে দেখা মায়ের মুখটা। আজ আবার ওর মায়ের গল্প শুনতে ইচ্ছে করে রিংকুর। ফুফু অনেক চমৎকার করে মায়ের গল্প শোনায়। ‘কি যে সুন্দর ছিল তোর মায়ের মুখটা! একদম রূপকথার পরিদের মতো মুখ। আর কি সুন্দর হাসি। কখনো মুখ ভার করে থাকতে দেখিনি ওকে। আমার ভাইজান মানে তোর বাবার সঙ্গেও কখনো ঝগড়া করতে বা মন খারাপ করে থাকতে দেখিনি। একদম মাটির মানুষ ছিলো তোর মা।’


একবার আমি তোর ফুপা আর জিসান বেড়াতে এলাম ভাইয়ের বাড়িতে। শায়লা যে কি খুশি। আমাদের কিভাবে আপ্যায়ন করবে ভেবে কী অস্থিরতা। ও নিজে রিক্সা নিয়ে বাজারে গেল। দুইটা বড় বড় ইলিশ মাছ নিয়ে এলো। আরো কত রকমের বাজার আনলো। ফ্রিজ থেকে জমাটবাঁধা গোস্ত বের করে পানিতে ভিজতে দিলো। ওর রান্নার হাত ছিল চমৎকার। কত পদের রান্না করলো। আমরা সাতদিন থাকলাম এখানে। তারপর ফিরলাম। ফিরে যাবার সময় শায়লার সে কি কান্না। আমাদের আরোও কয়েকদিন থেকে যেতে বলল। তোর ফুপার আবার সরকারি চাকরি। অনেক বুঝিয়ে তারপর আমরা ফিরলাম। আমাকে বুবু বলে ডাকত। সেই তোর ফুপার শেষ আসা এই বাড়িতে। এরপর কতো ঘটনা ঘটে গেল। সামান্য জ্বরে তোর ভাই জিসান মরে গেলো। তোর ফুপা রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেলো। আমিও একা হয়ে গেলাম। তোর মা প্রায়ই ফোন করতো। কত কথা বলতো, আর আমাকে বারবার করে ডাকতো।


তুই যখন আসবি আসবি অবস্থা। তখন বলতো, আমাদের একটা রাজপুত্র হবে। তুমি একটা রাজার মুকুট কিনে নিয়ে আসো। রাজপুত্রকে পরাবে না! আমি তোর জন্মের একদিন আগে আসলাম। পরেরদিন ভোরে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো শায়লাকে। ডাক্তার বলল অপারেশন করতে হবে। তাই হলো। তোর জন্ম হলো। এই গল্পটা ফুপুর কাছে অনেকবার শুনেছে রিংকু। গল্পটা ঠিক এই জায়গাতে আসলেই রিংকু ফুপুকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আর বলো না আম্মু, আর বলো না, পরেরটুক শুনতে ইচ্ছে করে না।’


বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে রিংকু। ওর বাবার গাড়ি এসে থামল বাড়ির সামনে। কিছুক্ষণের মধ্যে কলিংবেল বাজবে। ফুপু দরজা খুলে দিবেন। বাবা বাসায় ঢুকে ওকে ডাকবেন। মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলবেন, ‘কি খবর আমার রাজপুত্রের?’ তারপর হাত মুখ ধুয়ে এক কাপ চা খাবেন বাবা। তারপর অফিসের ফাইল নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করবেন। আর ফুফুজান ডাক দিয়ে বলবেন, ‘কই আব্বুটা পড়তে বসো।’


ফুপুর এই আদুরে ডাকটা শুনলেই মন জুড়িয়ে যায় রিংকুর। কোনদিনও ফুপুকে ওর ফুপু বলে মনে হয় না। মনে হয় তার সত্যিকারের মা। আর ওকে জন্ম দিতে গিয়ে হারিয়ে যাওয়া শায়লাকে মনে হয় কোনো এক রূপকথার দেশের কোন রাজপুত্রের মায়ের মতো।

Comment As:

Comment (0)