জানালাটা বন্ধ করে দাও

A+ A- No icon

বন্ধ জানালাটার দিকে তাকিয়ে আঁতকে ওঠে ঋতি। যখন-তখন সেই বিদঘুটে মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আর তখনই পেট গুলিয়ে ওঠে তার। বমি আসতে চায়। মনে হয় বমি করতে পারলেই শান্তি হতো। বমি করে সব কিছু ফেলে দিতে পারলেই যেন পৃথিবীর যত কিছু ঘৃণিত বস্তু আছে সব মুছে ফেলা যাবে। জানালার দিকে পিঠ দিয়ে শুয়ে থাকে ঋতি। যেন চোখ না পড়ে সে দিকে। কিন্তু মনের চোখ তো আর বেঁধে রাখা যায় না। মনে করতে না চাইলেও বারবার সে দিকে মন যায় বলে কষ্টে কেঁদে ফেলে সে।

 

অনেকক্ষণ ধরে কাঁদতে কাঁদতে শেষে ঘুমিয়ে পড়ে। ঘরে এসে নাবিল সোজা ঋতির কাছে যায়। নাবিলের পেছন পেছন ফুলকিও সেই ঘরে ঢোকে। বলে, আপা সন্ধ্যাকালে কানতে কানতে ঘুমায় পড়ে। বিকেলে কিছু খেতে দিয়েছিস?
না, জিজ্ঞেস করছিলাম কিছু খাইব কি না, তা আপা না করছে।
ঠিক আছে এখন কিছু খাবার তৈরি কর, আর চা দিস।
ফুলকি তখনো দাঁড়িয়ে আছে দেখে নাবিল বলল, দাঁড়িয়ে আছিস যে। কিছু বলবি?


বলছিলাম কি ভাইজান আমি আর ‘সুরভি’ স্কুলে যামু না। বাসায়ই নিজে নিজে পড়মু। আপারে ঘরে একলা রাইখা আমি আর কোথাও যামু না। বয়স এগারো বা বারো। কথায় কাজে বয়সের তুলনায় একটু পাকামিই আছে বলতে হবে। সাত আট বছর আগে ঋতিকে নিয়ে প্রথম যে বার মৌলভীবাজার বেড়াতে গেল নাবিল, সে বার নরসিংদী স্টেশনে এই মেয়েটিকে পায় তারা। কোথাও কোনো ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছিল বলে নরসিংদীতে নাবিলদের ট্রেনটি ঘণ্টাখানেক বিরতি দিয়েছিল।

 

তখন ছোট্ট ফুলকির বয়স তিন কি চার হবে। প্লাটফর্মে পা দুইখানা মেলে কেমন ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে ছিল ঋতির দিকে। ঋতির হাতে এক টুকরা কেক ছিল। ফুলকির তাকানো দেখেই মনে হলো মেয়েটি হয়তো অনেক ক্ষুধার্ত। ট্রেন থেকে নেমে ফুলকির কাছে গিয়ে কেকটি হাতে দিলো। ঋতির হাত থেকে কেক নিয়েই গোগ্রাসে খেতে থাকে মেয়েটি। ঋতির কেমন মায়া হয়। জিজ্ঞেস করে, কী নাম তোমার?


ফুলকি। বাহ্ সুন্দর তো! তুমি কি এখানেই থাক? তোমার মা কোথায়?
ফুলকি দুই দিকে মাথা দোলায়। তাদের পাশে দশ-বারো বছরের একটি মেয়ে ছিল। হাতে কতগুলো পানির বোতল। সে স্টেশনে পানি বিক্রি করে। সেই মেয়েটি বলল, ওর কেউ নেই। ওর মা ওকে রেখে অনেক দিন আগে কোথায় যেন চলে গেছে। এখন মেয়েটি এই প্লাটফর্মে একাই থাকে। কেউ খাইতে দিলে খায় না।
এই টুকুন বাচ্চা কেউ ফেলে রেখে যায়! অবাক হলো ঋতি। বলল, তুমি যাবে আমার সাথে?


বলতেই মেয়েটি দাঁড়িয়ে গেল। ওপর-নিচে মাথা দুলিয়ে জানাল যে সে যাবে। পাশের বড় মেয়েটি বলল, আপনি ওরে নিয়ে যান। ওর এখানে কেউ নেই। ফুলকিকে ওরা ঢাকায় নিয়ে এলো।
বছর দুয়েক হলো এলাকায় একটি বিদেশী সংস্থার সহায়তায় সুরভি স্কুল নামে একটি স্কুল চালু হয়েছে। সেই স্কুলে সন্ধ্যার পর এলাকার সব বাড়ির গৃহকর্মীরা পড়তে আসে। ফুলকিকেও ঋতি সেই স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলো। প্রতি সন্ধ্যায় ফুলকি সেজেগুজে স্কুলে যায়।


নিমকি আর চা খেতে খেতে নাবিল বলল, আজো বাসা খুঁজলাম। কিন্তু বাজেটের মধ্যে একটাও পেলাম না ঋতি। ছোট্ট ছোট্ট বাসা অথচ কী ভাড়া!
জানালাটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে মুখ ফিরিয়ে নেয় ঋতি। নাবিল বলে, শোন টেনশন করো না। ওই শয়তান আর বের হতে পারবে না। ওর নির্ঘাত সাজা হবে। কম করে হলেও দশ বছর। ফুলকি বলে, দশ বছর কী ভাইজান, ওই বদমাইশের তো ফাঁসি হওন লাগব। অর জন্য আমার আপা কেমন হইয়া যাইতাছে দিনে দিনে। হাসে না, কথা কয় না। আমারে পড়ায় না, বকে না। আদরও করে না। বলতে বলতে ফুলকি কেঁদে দিলো।


বাসাটা দক্ষিণে খোলা ছিল। হু হু করে বাতাস এসে ঘরে দোলা দিয়ে যেত। ঋতি বলত এই বাসা ছেড়ে আর কোথাও যাবো না। ঋতির শোবার ঘরের জানালা থেকে হাত পাঁচ-ছয় দূরে যে বাসাটা ছিল সেই ঘরেরও একটা জানালা ছিল বরাবর। প্রায়ই দেখত একটা কালো মোটা মতো লোক দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে। চোখের দৃষ্টি দিয়েই যেন ঋতিকে গিলে খেত। দেখলেই ঋতির কেমন ঘেন্না লাগত। এরপর লোকটাকে এড়াতে জানালাটা বন্ধ করে দিত।


একদিন সন্ধ্যায় ফুলকি স্কুলে যেতেই দরজায় বেল দিলো কেউ। নাবিল আসছে ভেবে দরজা খুলতে গেল ঋতি। দরজা খুলতেই পাশের বাসার সেই লোকটাকে দেখে ঋতি চমকে গিয়ে কিছু বুঝে ওঠার আগেই লোকটা ভেতরে ঢুকে নিজে থেকেই দরজাটা বন্ধ করে দিলো। এরপর ঋতির আর কিছু মনে নেই। ষোলো ঘণ্টা পর হাসপাতালের বিছানায় নিজেকে আবিষ্কার করে ঋতি। চেতনানাশক দ্রব্য দিয়ে অচেতন করে ফেলেছিল ঋতিকে।

 

তার পর লোকটির ঘৃণ্য জিঘাংসা আর লোলুপতার হাত থেকে রেহাই পায়নি ঋতি। মাত্র পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে ঋতির জীবনে ঘটে গেল মারাত্মক দুর্ঘটনাটি। দিন কতক বাদে নাবিল বাসায় এসে বলে, আর ভাবনা নেই। দারুণ একটা বাসা পেয়ে গেছি। এখান থেকে অল্প দূরে। বেশ খোলামেলা বাসা। টানা বারান্দা। আশপাশে বড় কোনো বাড়িও নেই। শুক্রবারেই আমরা সেখানে উঠব।

Comment As:

Comment (0)