রত্নাবতী

A+ A- No icon

‘অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে লিকলিকে লম্বা, শ্যামলা একটি মেয়ে সেকশপিয়ারের একটি ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করল। কী চমৎকার তার বাচনভঙ্গি। কত শুদ্ধ তার উচ্চারণ! আমি যেন হারিয়ে গেলাম তার আবৃত্তির নান্দনিক ঢেউয়ে। তার একেকটা শ্রুতিমধুর শব্দ যেন বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ল আমার হৃদয় পাড়ে।’


ঝিনুক পত্রিকা হাতে দৌড়ে এলো। বলল, ‘মিহির, একটা খুশির সংবাদ আছে।’ ঝিনুকের চোখে-মুখে আনন্দের ঢেউ। আমি অলস সকালে শুয়েছিলাম। ঘাড় উঁচু করে বললাম, ‘সাতসকালে কী এমন খুশির সংবাদ পেলে?’ ঝিনুক পত্রিকা দেখিয়ে বলল, ‘শিক্ষা ক্যাডারে আমার চাকরিটা হয়ে গেছে। দেখো, পত্রিকায় চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করেছে। আমার রোল তিন নম্বরেই আছে। দেখো, দেখো।’

 

আমি কম্বল ফেলে উঠে বললাম, ‘দেখি সত্যি বলছ নাকি ঠাট্টা করছ। আমি ফলাফলে চোখ রাখলাম। বললাম, ‘আরে তাইতো দেখছি। তোমার প্রথম গুলিটাই তাহলে নিশানাবদ্ধ হলো?’ পত্রিকা হতে চোখ সরিয়ে ঝিনুকের চোখে চোখ রেখে বললাম, ‘সত্যি কথা বলতে কী, তুমি এর চেয়ে বড় কিছুর যোগ্যতা রাখো।’ লক্ষ করলাম, ঝিনুকের চোখে পানি। ঝিনুকের দু’চোখের পানি মুছে দিয়ে বললাম, ‘ঝিনুক, তুমি কাঁদছ?’

 

ঝিনুক আমার গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। যেন হঠাৎ করেই আকাশ ফেটে বৃষ্টি হওয়ার মতো। সে বলল, ‘মিহির, আমি এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না। তোমার সহযোগিতার জন্যই আজ আমি এতটুকু আসতে পেরেছি। ঝিনুকের পিঠ চাপড়ে বললাম, ‘আমি সহযোগিতা করেছি সত্য; কিন্তু তোমাকে তো আমি কোনো পরীক্ষার খাতায় লিখে দিয়ে আসিনি। তোমার ভালো ফলাফল কিংবা চাকরিতে উত্তীর্ণ হওয়া সম্পূর্ণ কৃতিত্ব তোমার।’

 

ঝিনুক বলল, ‘আজ আমার মা-বাবা বেঁচে থাকলে কতই না খুশি হতেন। অথচ মা-বাবা দু’জনকেই হারিয়ে আজ আমি এতিম।’ ঝিনুকের এমন আবেগ আমার ভাবনাকে পেছনে তাড়িত করল। ঝিনুকের সাথে আমার প্রথম দেখা হয় প্রায় পাঁচ বছর আগে। আমি তখন থানা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার হিসেবে সদ্য যোগদান করেছি। একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে যোগদান করেছিলাম।

 

অনুষ্ঠানের একপর্যায়ে লিকলিকে লম্বা, শ্যামলা একটি মেয়ে সেকশপিয়ারের একটি ইংরেজি কবিতা আবৃত্তি করল। কী চমৎকার তার বাচনভঙ্গি। কত শুদ্ধ তার উচ্চারণ! আমি যেন হারিয়ে গেলাম তার আবৃত্তির নান্দনিক ঢেউয়ে। তার একেকটা শ্রুতিমধুর শব্দ যেন বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ হয়ে আছড়ে পড়ল আমার হৃদয় পাড়ে। প্রধান শিক্ষকের কাছে জানতে পারলাম, ওই মেয়েটি এই স্কুলের সাবেক ছাত্রী। সে এসএসসিতে গোল্ডেন পেয়েছে।

 

কিন্তু গত বছর সে ইন্টারমেডিয়েটে ফরম ফিলআপ করতে পারেনি; তার জেলে বাবার অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে। আমি এই মেয়েটিকে ডেকে কথা বললাম। সে শুধু এই কবিতাটিই নয়। ইংলিশ অনেক লেখক ও তাদের লেখা নিয়ে রয়েছে তার গভীর জ্ঞান। আমি আশ্চর্য হলাম। জিজ্ঞাস করলাম, ‘এগুলি তো তোমার পাঠ্য ছিল না তাহলে শিখলে কিভাবে?’ সে বলল, ‘আমার নিজস্ব আগ্রহ থেকেই শিখেছি।’

 

আমি অনুষ্ঠান শেষে জনসমক্ষে ঘোষণা দিলাম, ‘আমি এই মেয়েটির যাবতীয় শিক্ষা খরচ বহন করব।’ তাকে আমার মোবাইল নম্বর দিয়ে বললাম, ‘তোমার যেকোনো প্রয়োজনে আমাকে ফোন দেবে।’ সে বছর তাকে ইন্টারমিডিয়েটের ফরম ফিলআপ করালাম। পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করল। আবারো সে গোল্ডেন পেল। ইতোমধ্যে তার বাবা মারা গেল। ভেঙে পড়ল সে। আমি উৎসাহ দিলাম, ‘পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হয়ে তোমার মা-বাবার আশা পূরণ করতে হবে।’

 

সে নব উদ্যমে প্রস্তুতি নিতে লাগল। যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা। তার আগের দিন ঝিনুকের চাচা এসে বললেন, ‘স্যার, আমরা মূর্খ মানুষ, ঢাকার কিছুই চিনি না। আপনি একটা ব্যবস্থা করলে কৃতার্থ হতাম।’ আমি বললাম, ‘আপনারা আমাকে বিশ্বাস করলে আমি ঝিনুকের সাথে যেতে রাজি আছি। তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। সেদিন আমি নিজে ঝিনুককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় নিয়ে গেলাম। সে ইংলিশে ভর্তি হলো এবং যথারীতি প্রতিটি সেমিস্টারে সর্বোচ্চ সিজিপিএ পেতে লাগল।

 

ঝিনুক যখন তৃতীয় বর্ষে পদার্পণ করল, আমার মনের দুয়ার খুলতে শুরু করল। আমার খোলা দুয়ারের অন্ধকার ঘরে বিশাল সমুদ্রের সৃষ্টি হলো। আর সেই সমুদ্রের বিরাট সৈকতে ঝিনুক এসে ঠাঁই নিলো। আমার হৃদয় আঙিনায় ঝিনুকের অস্তিত্ব অনুভূত হতে লাগল। ঝিনুকের রূপসৌন্দর্য নয়, তার মধ্য বিরাজমান গুণই আমাকে অভিভূত করেছিল। তার নম্র কথাবার্তা, ভদ্র আচরণ, মেধা, অপার সম্ভাবনা সবই যেন চুম্বকের দুই মেরুর মতো, যার আকর্ষণ ক্ষমতা ছিল প্রবল।

 

আমি জানতাম ঝিনুকের চাচারা আমার প্রস্তাবে ‘না’ শব্দটি উচ্চারণ করবে না। কিন্তু ঝিনুকের মতামত নেয়া জরুরি। এমনও তো হতে পারে ঝিনুক কাউকে ভালোবাসে। একদিন ফোন করে বললাম, ‘ঝিনুক আজ বিকেলে টিএসসিতে এসো। কথা আছে। একটি রেস্তোরাঁয় বসে আমি ঝিনুক চা খাচ্ছিলাম। পড়াশোনা কেমন চলছে তা জানার পর আমি বললাম, ‘ঝিনুক আমি আজ এখানে এসেছি বিশেষ একটা ‘অফার’ নিয়ে।

 

‘অফারটা’ হলো... । অফারটা হলো, আমি অনেক চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, আমার জীবন সঙ্গী হিসেবে আমি তোমাকে চাই। তুমি এই সিদ্ধান্তে রাজি কিনা, আমাকে জানাবে। না না। এখনই না। তোমাকে আমি সময় দেবো। তুমি ভেবেচিন্তে আমাকে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ জানাবে। ঝিনুক মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল, ‘স্যার, আপনি আমার জন্য যা করেছেন, তার ঋণ আমি শোধ করতে পারব না।

 

তা ছাড়া এই উপকারের কথা বাদ দিলেও, আপনার মতো একজন লোককে জীবন সঙ্গী হিসেবে পাওয়া মানে আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। আর আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার দুর্লভ সুযোগ কে হারাতে চায়। কিন্তু স্যার, আমাদের মতো গরিবের ঘরে বাঁশের চাটাইয়ের বেড়ার ফাঁক দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদের আলো ঘরে প্রবেশ করলেও স্বয়ং চাঁদ ওই কুঁড়েঘরে প্রবেশ করা যে একেবারেই অসম্ভব। আমি মা-বাবা হারা এতিম সন্তান। আমি একজন তুচ্ছ জেলের মেয়ে।


এই পরিচয়টি আপনি মেনে নিলেও আপনার মা-বাবা কিংবা আপনার সমাজ কি মেনে নেবে?’ আমি বললাম, ‘তোমার মধ্যে যে কী আছে তা কেউ না জানলেও আমি জানি। নিজেকে এত ক্ষুদ্র মনে করো না।’ বাবার কানে সংবাদ পৌঁছে গেল। বাবা অগ্নিমূর্তি ধারণ করলেন। তিনি বললেন, ‘একজন সরকারি চাকরিজীবীর ছেলে, যিনি নিজেও একজন সরকারি অফিসার, তার সাথে একজন জেলের মেয়ের বিয়ে হতে পারে না।’

 

আমি বললাম, ‘বাবা, এই ঝিনুক মৃত ঝিনুক নয়, এই ঝিনুক হলো এমন এক ঝিনুক, যার ভেতর নিশ্চিত মণি-মুক্তা লুকিয়ে আছে। আমি নিজ চোখে দেখেছি।’ বাবা বললেন, ‘তোমার তাত্ত্বিক কথা আমি শুনতে রাজি নই। কোনো জেলের মেয়ে এ বাড়িতে আসতে পারবে না।’ অবশেষে ঝিনুককে বিয়ে করে এই বাসা ভাড়া নিলাম। হঠাৎ আমি সম্বিত ফিরে পেলাম। ঝিনুকের হাত আমার গলা হতে ছাড়িয়ে বললাম, ‘আমার মোবাইলটা দাও তো।

 

আমার মা-বাবাকে তো আমি চিনি। তারা এই খুশির খবর শুনে নিশ্চয় সব রাগ ভুলে যাবেন। ঝিনুক চোখ মুছে মোবাইল আমার হাতে তুলে দিলো। আমি মাকে ফোন দিয়ে বললাম, ‘মা, ঝিনুকের শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি হয়েছে। মায়ের খুশি যেন বাঁধ ভেঙে গেল। তিনি বললেন, ‘তাই নাকি?’ তিনি কানে ফোন রেখেই বাবাকে উদ্দেশ করে বলতে লাগলেন, ‘এই, তুমি শুধু শুধুই ছেলেটার ওপর রাগ করে আছো। শুনলে তো, ঝিনুকের শিক্ষা ক্যাডারে চাকরি হয়েছে।

 

বাবা বললেন, ‘কোথায়, দাওতো ফোনটা আমার হাতে। বাবা ফোন ধরে বললেন, ‘মিহির, বাবা, ঝিনুককে দাওতো, একটু কথা বলি। ঝিনুকের হাতে মোবাইল দিয়ে বললাম, ‘ঝিনুক, বাবা তোমার সাথে কথা বলবে।’ বাবা ঝিনুককে বললেন, ‘মা ঝিনুক। আমরা এখনই আসছি তোমাদের বাসায়।’ ঝিনুক আর আমি একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলাম। বেদনা নয়, সুখের কান্না ।

Comment As:

Comment (0)