বই-ই জীবনের প্রকৃত বন্ধু

A+ A- No icon

‘বন্ধু’ শব্দটি কতই মধুর! বন্ধুত্ব নৈকট্যের পরিচয়বাহী, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি, ভালোবাসা ও হৃদ্যতা এবং পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও মানসিক বন্ধনের প্রতীক। বন্ধুত্বের ফাটল বেদনাদায়ক হলেও অস্বাভাবিক নয়; যখন তখন লক্ষণীয়। অনেকে আজ বন্ধু কাল শত্রু। বন্ধু হয়ে বেঈমানি আর বিশ্বাসঘাতকতা কারো কাম্য নয়। কিন্তু অপ্রত্যাশিত হলেও অহরহ ঘটছে। শুধু বন্ধু কেন পারস্পরিক স্বার্থের দ্বন্দ্বে বাবা-মা, ভাইবোন, নিকট আত্মীয়স্বজন ও পাড়া প্রতিবেশীদের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে দূরত্ব।

 

ছড়িয়ে পড়ছে হিংসা হানাহানি। পিপীলিকা যেমন বিপদে পানিতে পতিত গাছের পাতাকে বাঁচার অবলম্বন করে নেয়, তেমনি মানুষও বিপদ হতে বাঁচতে চায়, একটু আশ্রয় খোঁজে। প্রয়োজন হয় ভালো বন্ধুর। রক্ত মাংসে গড়া মানুষকে যেখানে বন্ধু হিসেবে ভেবেও সন্দেহ হয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল কাজ করে, সেখানে মানুষের প্রকৃত বন্ধু হতে পারে বই। বইয়ের মতো ভালো বন্ধুর সাথে আমাদের সম্পর্ক খুবই কম। বন্ধুত্বের গুরুত্বপূর্ণ সময়টুকু কেড়ে নিচ্ছে মোবাইল ফোন।

 

শুধু তরুণ ছাত্রছাত্রী কেন, ছেলে বুড়ো একই অবস্থা। বই পড়ার প্রতি আমাদের চাপ নেই বললেই চলে, যতটুকু আছে ততটুকু নির্ধারিত পাঠ্যবই। এর বাইরে যেতে নারাজ। একসময় বাবা-মা পাঠ্যবইয়ের বাইরে অন্য বই পড়তে নিষেধ করতেন। এখন ধারণা অনেকটা পাল্টেছে। আমাদের সময় সহপাঠ হিসেবে চয়নিকা পড়তে হতো। পাঠ্যবই পড়তাম বাধ্য হয়ে, আর চয়নিকা পড়তাম মনের আনন্দে। এখন স্কুলগুলোতে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি শিক্ষামন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় নানামুখী বই পড়ার অভ্যাস গঠন কার্যক্রম পরিচালিত হয়।


বই পড়ার জন্য প্রয়োজন মানসিকতা, বই থেকে উপকার পাওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা। দরিদ্রতা বই না কেনার কারণ হতে পারে, কিন্তু বই না পড়ার কোনো কারণ নয়। বই এখন সহজলভ্য। স্কুল-কলেজের লাইব্রেরিতে প্রচুর বই পাওয়া যায়, শহরের পাবলিক লাইব্রেরিতেও বই পড়া যায়। এছাড়া অনেক গ্রামগঞ্জেও বিভিন্ন নামে গড়ে উঠেছে গ্রন্থাগার। নিকটস্থ বন্ধুর কাছ থেকেও বই ধার নিতে পারেন। আর টাকা খরচ করে বই কিনলে তো কথাই নেই। যত ইচ্ছা তত বই কিনতে পারেন। আমাদের দেশে এখন প্রকাশনীও অনেক।

 

একুশের বইমেলাকে উপলক্ষে করে তো বটেই, তবে এছাড়াও সারা বছর প্রতিনিয়ত প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে। ইচ্ছা থাকলে পছন্দের বই পেতে খুব বেশি কষ্ট হয় না। বৈষয়িক লাভের কথা চিন্তা করলে বই পড়া সম্ভব নয়। বই হয়ত আপনাকে তাৎক্ষণিক কোনো লাভ দিতে পারবে না। কিন্তু তাই বলে কী আপনি বই পড়া বন্ধ করবেন? তাতে কার ক্ষতি? আপনার, লেখক না প্রকাশকের? বংশানুক্রমিক বইয়ের প্রতি অনাগ্রহ চলতে থাকলে আপনি নিশ্চয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং আপনার জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

 

আপনার জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হোক এটা কী আপনি চাইবেন? উত্তরে নিশ্চয়ই বলবেন কখনো না, তাহলে বই পড়–ন। বই পড়তেন পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম (১০৪৪-১১২৩)। বই পড়া ছিল তার নেশা। কোনো বই হাতে পেলেই তা পড়ে শেষ করে ফেলতেন। জ্যোতির্বিজ্ঞান, বীজগণিত ও জ্যামিতি ছিল তার প্রিয় বিষয়। এছাড়া দর্শন শাস্ত্রেও ছিল তার অসাধারণ ব্যুৎপত্তি। তিনি বলেছেন, ‘সূর্যের আলোতে যেরূপ পৃথিবীর সকল কিছুই ভাস্বর হয়ে ওঠে, তেমনি জ্ঞানের আলোতে জীবনের সব অন্ধকার আলোকোদ্ভাসিত হয়ে ওঠে।’


বিশ্ববিখ্যাত ‘মা’ গ্রন্থের রচয়িতা, ম্যাক্সিম গোর্কি (১৮৬৮-১৯৩৬)। তার মা অল্প বয়সে মারা গেলে কঠিন সমস্যায় পড়ে গেলেন। দাদামশাই দায়িত্ব নিতে চাইলেন না। জীবনে কখনো জুতোর দোকানে বয় হিসেবে, কখনো কয়েদি বহনকারী জাহাজে থালা বাসন ধোয়ার কাজ করেছেন। জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে এক পেশা থেকে আরেক পেশায় বড় হয়েছেন। তবে সবকিছুর মধ্যেও বই পড়া ছিল তার নেশা। বইয়ের কোনো বাচবিচার ছিল না, যখন যে বই পেতেন সর্বভূকের মতো তাই পড়তেন। দরিদ্রতা ছিল তার নিত্যসঙ্গী।

 

সন্ধ্যা থেকে দুপুর পর্যন্ত একটানা রুটির দোকানে কাজ করেও ফাঁকে ফাঁকে যতটুকু সময় পেতেন ততটুকু সময়ই বই পড়তেন। বই পড়তে পড়তেই তিনি লব্ধ জ্ঞানের বহিঃপ্রকাশ ঘটান বিশ্ববিখ্যাত লেখক হয়ে। বই পড়ে নিজ স্ত্রীর হাতে চমকপ্রদ শাস্তি পেয়েছেন বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিস (৪৬৯-৩৯৯ খৃ.পূ.)। প্রথম স্ত্রী জ্যানথিপি (ঢধহঃযরঢ়যব) ছিলেন ভীষণ রাগী মহিলা। সাংসারিক ব্যাপারে তিনি সক্রেটিসের উদাসীনতা কখনো মেনে নিতে পারতেন না।


একদিন সক্রেটিস গভীর একাগ্রতার সাথে একখানা বই পড়ছিলেন, প্রচণ্ড বিরক্তিতে তিনি গালিগালাজ শুরু করে দিলেন। কিছুক্ষণ সক্রেটিস স্ত্রীর বাক্যবাণে কর্ণপাত করলেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ধৈর্য রক্ষা করতে না পেরে বাইরে গিয়ে বইটি পড়া আরম্ভ করলেন। স্ত্রী সহ্য করতে পারলেন না। তিনি এক বালতি পানি এনে তার মাথায় ঢেলে দিলেন। সক্রেটিস মৃদু হেসে বললেন, আমি আগেই জানতাম যখন এত মেঘ গর্জন হচ্ছে, তখন শেষ পর্যন্ত একপশলা বৃষ্টি হবেই।


আপনিও বইকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন। জ্ঞানী ব্যক্তিরা জ্ঞানের মূল্য বোঝেন তাই তারা বই পড়েন। ভীত ছাত্রছাত্রী বই পড়েন শিক্ষকের বেত্রতাড়নার জোরে অথবা মা-বাবার মারের চোটে। কেউ পড়েন শিক্ষক বা বাবা-মাকে খুশি করার জন্য। বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে বই পড়ে পরীক্ষা নামক বৈতরণী পার হওয়ার জন্য। আনন্দপিপাসু বই পড়েন মনের আনন্দ থেকে। আর জ্ঞানী ব্যক্তি বই পড়েন জ্ঞান আহরণের জন্য। বই মানুষের জ্ঞানের চক্ষুকে করে প্রস্ফুটিত এবং হৃদয়কে করে আলোকিত।

 

সেই আলোয় আলোকিত হয় দেশ, সমাজ ও জাতি। ভালো বই মানবজীবনকে সুন্দর ও মহৎ করে তোলে। মানুষের মনে জাগিয়ে দেয় মানবতাবোধ। যুগ যুগ ধরে যে সত্য ও সুন্দরের সাধনা তা এনে দিয়েছে বই। বই দৃষ্টিকে করেছে উদার, মনকে করেছে উন্নত; হতাশা ও বিষাদ থেকেও দিয়েছে মুক্তি। শরৎচন্দ্র চট্টপাধ্যায়ের ভাষায়, ‘বই পড়াকে যে যথার্থ হিসেবে নিতে পারে, সংসারের দুঃখ কষ্টের বোঝা তার অনেকখানি কমে যায়।’


বই-ই মানুষের প্রকৃত বন্ধু। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে মানুষের জীবন যখন জর্জরিত তখন আপন মানুষগুলো দূরে সরে গেলেও বই-ই দিতে পারে প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয়। মানুষকে হতাশা থেকে মুক্তি দিয়ে, জ্ঞান ও সত্যের সন্ধান দিয়ে সঠিক পথে চালিত করতে পারে। বই কখনো দূরে সরে যায় না। বিপদে সে আনন্দ ও সান্ত্বনার বাণী শোনায়। বাট্রান্ড রাসেলের মতে, ‘সংসারের জ্বালা-যন্ত্রণা এড়াবার প্রধান উপায় হচ্ছে মনের মধ্যে আপন ভূবন সৃষ্টি করে নেয়া এবং বিপদকালে তার মধ্যে ডুব দেয়া। যে যত বেশি ভুবন সৃষ্টি করতে পারে, ভবযন্ত্রণা এড়াবার ক্ষমতা তার ততই বেশি।’


বই মানুষকে আনন্দদান করেই ক্ষ্যান্ত থাকে না, বিশ্বের খবরাখবর জানিয়ে দেয়। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মনীষীদের সান্নিধ্য আমরা বইয়ের মাধ্যমেই লাভ করতে পারি। যুগে যুগে মানুষের জ্ঞান, বিজ্ঞান, শিল্প সাহিত্য সাধনার নীরব সাক্ষী বিশ্বের অজস্র বই। বই অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে সংযোগ করে দেয়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাষায়, ‘মানুষ বই দিয়ে অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে সাঁকো বেঁধে দিয়েছে।’


এই সাঁকো দিয়েই আমরা জ্ঞানের এক সাগর থেকে আরেক সাগরে পাড়ি দিচ্ছি, সভ্যতা ও সংস্কৃতির এবং জ্ঞান ও বিজ্ঞানের ক্রমোন্নতির পথে অগ্রসর হচ্ছি। মানব দেহের সুস্থতার জন্য যেমন খাদ্যের প্রয়োজন, তেমনি দেহের অভ্যন্তরে অদৃশ্য মনের পিপাসা মেটানোর জন্য প্রয়োজন অদর্শ খাদ্যের। আর সেই খাদ্য হচ্ছে আনন্দ রস। বই-ই আপনাকে সে রস দান করতে পারে। তাই বইকে আপনি অনায়াসে রসিক বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করতে পারেন।

 

পারস্যের কবি ওমর খৈয়াম বেহেশতের উপকরণের মধ্যে বইকেও স্থান দিয়েছেন। কবির ভাষায়, ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলা হয়ে আসবে; কিন্তু একখানা বই অনন্তযৌবনা যদি তেমন বই হয়।’ বই পড়ে আমরা সত্যিকার অর্থেই লাভবান হই। অর্থ সম্পদ নয়, জ্ঞানসম্পদই বড়। আর এ জ্ঞান আমরা লাভ করি বই পড়ে। তাই বইয়ের কাছে আমরা চিরঋণী। বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক ম্যাক্সিম গোর্কিও তাই বলেছেন-‘আমার মধ্যে উত্তম বলে যদি কিছু থাকে তার জন্য আমি বইয়ের কাছে ঋণী।’


আজকের এ আধুনিক বিশ্ব জ্ঞানী ব্যক্তির জ্ঞান সাধনারই ফসল। আর জ্ঞান সাধনার মূল উপকরণই হল বই। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছে বই। মানব জীবনকে সুন্দর, সহজ ও উপভোগ্য করেছে বই এবং ভবযন্ত্রণাকে এড়িয়ে জীবনকে হাসি ও আনন্দে ভরিয়ে দিচ্ছেও বই। জ্ঞানী ব্যক্তি বইকে প্রকৃত বন্ধু হিসেবে মনে করেন বলেই জ্ঞান সাধনা করতে করতে বইয়ের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন।

 

Comment As:

Comment (0)