ফ্রেডি

A+ A- No icon

দুমদাম ঠনাত্। নিচের রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা বাসনকোসনের শব্দে মি. ওয়েলসের ঘুম ভেঙে গেল হঠাত্। তিনি এখনো পুরো মেলেননি চোখ, মনে হলো স্ত্রী মিলি বুঝি নাশতার জোগাড় করছেন। পরক্ষণে মনে পড়ল মিলি তো বেঁচে নেই। অ্যাপেনডিসাইটস ফেটে ছয় বছর আগে প্রেমময়ী স্ত্রী তাঁকে ছেড়ে ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন। আর তখন থেকে এই শূন্য বাড়িতে তিনি একা।

 

স্ত্রীকে মনে পড়তেই বুকের গভীর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে মিশে গেল ভোরের বাতাসে। বিছানা থেকে নামলেন তিনি, জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। ঠন্ ঠন্ শব্দটা এখনো শোনা যাচ্ছে। রান্নাঘরে নিশ্চয়ই ফ্রেডি রয়েছে, নাশতা তৈরিতে ব্যস্ত। কথাটা ভাবতেই মৃদু হাসি ফুটল ঠোঁটে। ‘মি. ওয়েলস, খেলায় তুমি তাহলে জিতে গেছ!’ মনে মনে বললেন তিনি। ধীরে-সুস্থে বাথরুম সারলেন মি. ওয়েলস। শেভ করলেন।

 

মৃদু হাসির রেখাটি ফুটেই আছে ঠোঁটে। তিনি নিচে না নামা পর্যন্ত ছোকরা ভাগবে না, এ ব্যাপারে নিশ্চিত। আয়নায় নিজেকে দেখছেন মি. ওয়েলস। দৃষ্টিতে নতুন চাঞ্চল্য। প্রতি মাসেই তিনি যেন নতুন করে আরও নবীন হচ্ছেন। আসলে বেঁচে থাকার প্রেরণা খুঁজে পেয়েছেন তিনি ইদানীং, জীবন নতুনরূপে ধরা দিয়েছে তাঁর কাছে। কিন্তু একটা সময় এমনটি ছিল না। নিজেকে বড় নিঃস্ব মনে হতো তাঁর।

 

মিলি, যিনি ছিলেন তাঁর কাছে স্ত্রীর চেয়েও বেশি, মায়ের মতোও, তাঁর মৃত্যুর পর জীবনটা আক্ষরিক অর্থেই শূন্য মনে হয়েছিল। সবকিছুর ওপর বীতশ্রদ্ধ, হতাশ হয়ে একবার বাথরুমে ঢুকেছিলেন ভয়ংকর একটি পরিকল্পনা নিয়ে। এ জীবন আর রাখবেন না। বেঁচে থেকে কী হবে? করবেনটা কী তিনি? তাঁর আছে কে? ত্রিশটা বছর একটা জীবন বিমা কোম্পানিতে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে গেছেন, অবসরও নিয়েছেন সময়মতো, কিন্তু স্ত্রী যেদিন মারা গেলেন, বুঝতে পারলেন এ পৃথিবীতে তিনি বড়ই একা।

 

বন্ধুবান্ধব, সন্তানসন্ততি কেউ নেই তাঁর। থাকার মধ্যে আছে শুধু ব্যাংকে কিছু টাকা আর হাতে অনন্ত সময়, সে সময় এক বিশাল শূন্যতা নিয়ে গ্রাস করে আছে তাঁকে। এই অসহ্য শূন্যতা থেকে মুক্তি পেতে চান তিনি, দুনিয়ায় বেঁচে থাকার আর কোনো সাধ নেই তাঁর। রেজরটা কবজিতে বসিয়েও দিয়েছিলেন, কিন্তু সামান্য একটা আঁচড় কাটা ছাড়া আর কোনো ক্ষতিই হয়নি তাঁর। আসলে ওই সময় তাঁর দৃষ্টি চলে গিয়েছিল খোলা মেডিসিন কেবিনেটের দিকে। এক প্যাকেট ফুলের বীজ রাখা ছিল এখানটায়।

 

মিলিই কোনো একসময় হয়তো রেখেছিলেন। ভেবেছিলেন পরে বাগানে লাগাবেন। বাগান করার বড় শখ ছিল তাঁর। কিন্তু ওই বীজ আর অঙ্কুরিত হওয়ার সুযোগ পায়নি। যেমনটি মিলি রেখে গিয়েছিলেন, তেমনই আছে এখনো। খোলা প্যাকেটটার দিকে তাকিয়ে বুক হু হু করে উঠেছিল মি. ওয়েলসের। চোখ ছাপিয়ে জল এসেছিল। পরম মমতায় প্যাকেটের গায়ে হাত বুলিয়েছেন তিনি। রেজরটা একপাশে সরিয়ে রেখে কাঁপা হাতে তুলে নিয়েছেন প্যাকেট।

 

তখন যদি কেউ তাঁকে দেখত, তবে দেখতে পেত ঝরঝর করে গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে মি. ওয়েলসের, নিঃশব্দে কাঁদছেন তিনি। কাঁদতে কাঁদতেই পরিষ্কার করছেন মিলির রেখে যাওয়া টব, বাড়ির পেছন থেকে নতুন মাটি এনে ভরছেন তাতে, বৃত্তাকারে পুঁতে দিচ্ছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে মি. ওয়েলস দুই ডজন বীজ লাগালেন। এক মাসের মধ্যে মিলির বাগানের সব জায়গায় ফুলের গাছ লাগানো হয়ে গেল। বসন্তে হেসে উঠল বাগান। সেই হাসি ছুঁয়ে গেল মি. ওয়েলসের অন্তর।

 

তিনি নতুন করে উপলব্ধি করতে পারলেন জীবনে পরিবর্তন এসেছে, এই সুন্দর ভুবন ত্যাগ করতে ইচ্ছে করছে না আর। জীবন মনে হচ্ছে না অর্থহীন। মিলির ফুলবাগান করার সেই শখ নতুন উদ্দীপনার সঞ্চার করেছে তাঁর মধ্যে, সব সত্তা দিয়ে এই উদ্দীপনাটুকু উপভোগ করছেন তিনি। তারপর একদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পরেই তিনি সম্পূর্ণ নতুন একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন। আর তারই অনিবার্য ফল হিসেবে তাঁর কাছে আসে এই ছেলেটি—ফ্রেডি।

 

‘আমি আমার বাকি জীবন শিশু-কিশোর অপরাধীদের গাইড হিসেবে কাজ করে যেতে চাই’ কথাটি তিনি বলেছিলেন স্থানীয় কিশোর পুনর্বাসন সংস্থার পরিচালককে। ওই দিন সকালেই চলে এসেছিলেন তিনি এখানে। ‘একটি বিশেষ শখ যদি আমার জীবনটাকে নতুন করে অর্থবহ করে তুলতে পারে, তাহলে আমার বিশ্বাস এই শিশু-কিশোরদের কোনো বিশেষ শখে আগ্রহী করে তুলতে পারলে ওদের জীবনটাও বদলে যেতে পারে।’

 

‘অনেক ক্ষেত্রে উল্টোটাও তো ঘটতে পারে’, সতর্ক করে দেওয়ার সুরে বলেছিলেন পরিচালক।

‘কিন্তু আমি অন্তত একটু চেষ্টা করে দেখতে চাই। শখের বশেই আমি এখন একজন আর্ট-হর্টিকালচারিস্ট। আমাকে নাহয় একটু চেষ্টা করতে দিন। সুযোগ দিন কয়েকটি বাচ্চার সঙ্গে কাজ করার। আমি ওদের শেখাব কীভাবে ফুলগাছ লাগাতে হয়, ভালোবাসতে হয় ফুল। আমার বিশ্বাস, ফুলের মতো পবিত্র জিনিসের সঙ্গে থাকলে ওদের মনও সুন্দর হয়ে উঠবে, নতুন আশার আলো দেখতে পাবে।’

 

‘ঠিক আছে, মি. ওয়েলস’, পরিচালক তাঁর কণ্ঠে একাগ্রতা লক্ষ করে রাজি হলেন।

‘আপনি তাহলে আমাদের একজন ভলান্টিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করে দিন। আশা করব আপনি সফল হবেন।’

 সেই থেকে শুরু। পাঁচ থেকে নয় বছরের বাচ্চাদের নিয়ে কাজ শুরু করলেন মি. ওয়েলস। সারাক্ষণ ওদের নিয়েই পড়ে থাকেন। খুব যত্ন করে শেখান কীভাবে ফুলগাছ লাগাতে হয়, বীজ পুঁততে হয়, দিতে হয় পানি।

 

শুধু ফুলগাছ লাগানোই নয়, তিনি ওদের মহা উত্সাহে দাবা খেলা শেখালেন, কাপড়ের পুতুল তৈরি করে দিলেন, শেখালেন জাদু, এমনকি রান্না করাও। খুব দ্রুত সফলতা এল তাঁর। অনেক ছেলেই তাঁর উত্সাহে সাড়া দিয়েছে। ওরা এরপরও কোনো অপরাধমূলক কাজ করত কি না তা অবশ্য মি. ওয়েলস জানেন না, কিন্তু ওদের প্রত্যেকের মধ্যেই একটি  করে শখের জন্ম দিতে সমর্থ হয়েছেন ভেবে সন্তুষ্ট বোধ করলেন। আর সেটুকুই তাঁর সবচেয়ে বড় পাওয়া।

 

‘আপনার কাজের জন্য আমরা আপনাকে অভিনন্দিত করতে চাই, মি. ওয়েলস’, পরিচালক অবশেষে একদিন বললেন তাঁকে। ‘ছেলেগুলোর মধ্যে আপনি সত্যিই বেশ পরিবর্তন আনতে পেরেছেন।

‘প্রত্যেকেরই আসলে একটি শখ থাকা দরকার।’ বিনয়ে বিগলিত হয়ে বললেন মি. ওয়েলস, যেন সোনার মেডেল দিয়ে এইমাত্র তাঁকে অভিনন্দিত করা হয়েছে। তারপর একদিন সোনালি চুলের ফ্রেডির আগমন ঘটল ওখানে। মুখটা গোমড়া করে রেখেছিল সে, অথচ দেখতে দেবদূতের মতো। আর ওর চোখ দুটো বরফের মতো ঠান্ডা, যা ১৬ বছর বয়সী একটি ছেলের জন্য নিতান্তই বেমানান।

 

‘আপনার জায়গায় আমি হলে ফ্রেডির ব্যাপারে খুব সাবধানে থাকতাম’, সুপারিনটেনডেন্ট সতর্ক করে দিলেন মি. ওয়েলসকে। ‘শিক্ষানবিশ হিসেবে ওকে ‘রিফর্ম স্কুল’ থেকে নিয়ে আসা হয়েছে। ও আসলে অন্য ছেলেদের চেয়ে একটু আলাদা। ওকে নিয়ে কাজ করার আগে আপনার বোধ হয় উচিত হবে ওর ডোশিয়ারটা পড়ে দেখা।’

 

মি. ওয়েলস ফ্রেডির ডোশিয়ার পড়লেন। বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন তিনি সবটা পড়ে। আট বছর বয়সে এই ছেলে প্রথম গ্রেপ্তার হয় চার্চের জানালা ভাঙার অপরাধে। দশ বছর বয়সে আবারও ওকে গ্রেপ্তার করা হয়। অপরাধ—এক ইহুদি ব্যবসায়ীর বাড়িতে স্বস্তিকা এঁকেছিল সে। তারপরও বহুবার হাতকড়া পরতে হয়েছে ওকে। বেশির ভাগ অপরাধ ছিল ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড এবং মদপানসংক্রান্ত।

 

আর ১৬ বছর বয়সে সে তার সর্বশেষ অপকর্মটি করে—পার্কে এক লোককে গলা টিপে প্রায় মেরে ফেলার জোগাড় করেছিল। এরপরই ওকে কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানো হয়। ছয় মাস প্রবেশন পিরিয়ডের পর রিলিজ করা হয়েছে ফ্রেডিকে।

‘থাকগে, ছোঁড়া অন্তত ড্রাগ নেয় না।’ মনে মনে ভেবেছেন মি. ওয়েলস। তারপর মনোযোগ দিয়েছেন তাঁর নতুন অ্যাসাইনমেন্টের দিকে।

‘অবসর সময় তুমি কী করো, ফ্রেডি?’ পরিচয়পর্ব সেরে নেওয়ার পর জিজ্ঞেস করলেন তিনি। ছেলেটি হাতের বইটা নামিয়ে রেখে নিষ্পাপ চোখে তাকাল তাঁর দিকে।

 

‘জিনিসপত্র ভাঙি।’ শান্ত সুরে বলল সে। যেন জিনিসপত্র ভাঙাটা স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজেরই একটা অংশ।

‘তাই বুঝি? কিন্তু জিনিসপত্র ভাঙাটা আসলে খুব একটা গঠনমূলক কাজ নয়, কী বলো?’

‘অবশ্যই। আমি তো অগঠনমূলক কাজ করতেই বেশি ভালোবাসি।’

‘অগঠনমূলক?’

‘হ্যাঁ। এই পুরোনো বিল্ডিংয়ের দরজা-জানালা ভেঙে ফেলা আরকি।’

 

‘কিন্তু এত অল্প বয়সে বোধ হয় তোমার এসব কাজকাম করা ঠিক না, বাছা। যাকগে, তোমার বিশেষ কোনো শখটখ আছে?

‘শখ দিয়ে কী হবে?’

‘সবারই নির্দিষ্ট শখ থাকা দরকার।’

‘আমার শখ কী, সত্যিই আপনি জানতে চান বুঝি?’ চোখে শয়তানি ফুটে ওঠে ফ্রেডির। সেই দৃষ্টির সামনে ভারি অস্বস্তিবোধ করলেন মি. ওয়েলস। আর কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলেন না।

 

তারপর আরেক দিন। ফ্রেডি লাঞ্চ করছিল। তার পাশে বসে আলাপ শুরু করলেন মি. ওয়েলস।

‘কী খাচ্ছো, ফ্রেডি? পটেটো প্যানকেক নাকি?’

‘হ্যাঁ। আমি নিজেই বানিয়েছি।’

‘তুমি রান্নাও করতে পারো দেখছি। বেশ বেশ। তা প্রতিদিনই করো নাকি?’

‘মাঝে মাঝে। যখন রাঁধুনি বুড়োটা রান্না করতে আসে না, তখন। আলু দিয়ে বিভিন্ন পদ তৈরি করি। কখনো কখনো আলুর মধ্যে বিভিন্ন জিনিস ফেলে দিই।’

‘যেমন?’

 

‘পেঁয়াজ, পনির, আপেল ইত্যাদি ইত্যাদি।’

‘বাহ্ চমত্কার। তা তুমি কখনো ‘পটেটো হল্যান্ডিস’ খেয়েছ? খাওনি? ইশ্, তাহলে তো বিরাট মিস করেছ দেখছি। ফ্রান্সের রাজাদের খুব প্রিয় খাবার ছিল এটা, জানো?’

‘ওটার মধ্যে কী কী দিতে হয়?’

‘চিকেন স্টক, লেমন জুস, পার্সলে—এমনি আরও অনেক কিছু।’

‘ওসব জিনিস আমাদের বাড়িতে যে নেই!’

‘তাতে কী হয়েছে!’ সুযোগ বুঝে মোক্ষম চালটা চাললেন মি. ওয়েলস। ‘তুমি আমার রান্নাঘরটাই তো স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারো। আমি নিজেই জিনিসগুলো এনে দেব তোমাকে। কোনো অসুবিধেই হবে না, দেখো।’

 

 ফ্রেডি রান্নার ব্যাপারে আগ্রহী, এই সত্যটা আবিষ্কার করতে পেরে মি. ওয়েলস ভারি উল্লসিত হয়ে উঠলেন। মনে হলো প্রথম রাউন্ডে তিনি জয়লাভ করেছেন। আর যখন ফ্রেডি সত্যি সত্যি তাঁর বাড়িতে রান্না করতে এল, তখন খুশিতে তিনি বগল বাজাতে শুরু করলেন। ফ্রেডি রান্না করে। বিশ্রী রকম পোড়া আর অতিশয় কুখাদ্য সেই রান্না শেষ করে আবর্জনা না ফেলেই চলে যায় সে, পরিষ্কার করার প্রয়োজনও বোধ করে না। অবশ্য মি. ওয়েলস ধৈর্য ধরে সব সয়ে যাচ্ছেন।

 

নিজ হাতে রান্নাঘরের ময়লা পরিষ্কার করতে করতে তিনি ভাবেন গঠনমূলক কিছু সৃষ্টির জন্য সামান্য ঝামেলা আসলে কোনো ব্যাপারই নয়। দুই সপ্তাহে বার পাঁচেক এল ফ্রেডি রান্না করতে। নিত্যনতুন অখাদ্যের মধ্যে একদিন হঠাত্ করেই তার রান্না করা কর্নড বিফ ভালো লেগে যায় মি. ওয়েলসের। জিনিসটা চাখতে চাখতে উত্ফুল্ল হয়ে উঠলেন তিনি। ফ্রেডির প্রতি বিশ্বাস জন্মে যাচ্ছে তাঁর, এ ছোকরা পারবে।

 

‘কখনো সকালবেলা যদি তোমার ইচ্ছে করে এখানে আসতে, ঝট করে চলে এসো,’ উদারভাবে ওকে অনুমতি দিলেন তিনি। ‘পেছনের দরজাটা খোলাই থাকবে। আমার জন্য নাহয় নাশতা তৈরি কোরো একদিন ভোরে। কী বলো, অ্যা?’ এবং আজ ভোরে রান্নাঘরে ঝন্ ঝন্ ঠন্ ঠন্ আওয়াজ শুনে নতুন করে আবারও বিজয়োল্লাস অনুভব করলেন মি. ওয়েলস। যে ছোকরার অত্যাচারে অতিষ্ঠ ছিল সবাই, সেই কি না এই সাতসকালে এসে তাঁর জন্য নাশতা তৈরি করছে। ভাবতেই হাসি আর ধরে রাখতে পারছেন না তিনি।

 

ব্যাপারটা যেন বনের বাঘকে জঞ্জাল সাফ করতে বাধ্য করার মতো। আত্মবিশ্বাসে ভরপুর মি. ওয়েলস দুলকি চালে নেমে এলেন সিঁড়ি বেয়ে নিচে; হলরুম পেরিয়ে রান্নাঘরের সামনে এসে দাঁড়ালেন। হাসিমুখে খুলে ফেললেন দরজা। চোখের সামনে দৃশ্যটা দেখে হাসি নিমেষে উধাও হয়ে গেল মুখ থেকে, চোখ বড় বড় হয়ে উঠল অপ্রত্যাশিত বিস্ময়ে। রান্নাঘরের অবস্থা ভয়াবহ। মেঝে আর আসবাবগুলো ময়দা মেখে ভূত হয়ে আছে।

 

টেবিলক্লথ আর পর্দা চটচটে সস আর তরল চাটনিতে মাখামাখি। কৌটাগুলো গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেতে। আর   ফ্রেডি ছোকরা স্টোভটার সামনে দাঁড়িয়ে দিব্যি দাঁত বের করে হাসছে। লোহার ফ্রাইপ্যানটা ওর হাতে।

‘ফ্রেডি, এর মানে কী!’ প্রচণ্ড রাগে গলা বুজে এল মি. ওয়েলসের।

‘আমি ঠিক করেছি, কারও জন্য আমি নাশতা বানাতে পারব না,’ বলল ফ্রেডি। ‘আর রান্না করাটা মোটেও ভালো শখ না। নিকুচি করি আমি এসব শখের।’

‘তুমি আমার রান্নাঘরটাকে শেষ করেছ।’

 

‘এখনো তো শুরুই করিনি,’ বলেই ছোকরা হাতের ফ্রাইপ্যান দিয়ে জোরে বাড়ি মারল চিনামাটির তৈরি অপূর্ব তৈজসপত্রগুলোর ওপর। মি. ওয়েলসের বড় শখের জিনিস। বাসনগুলো ভাঙার শব্দ বিস্ফোরণের মতো কানে এসে বাজল। রাগে আগুন হয়ে উঠলেন তিনি, দৌড়ে গেলেন ওর দিকে। কবজি চেপে ধরলেন গায়ের শক্তি দিয়ে। কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দ যুদ্ধ হলো দুজনের মধ্যে। ফ্রাইপ্যানটা কেড়ে নিতে চাইছেন মি. ওয়েলস, ফ্রেডি কিছুতেই ছাড়ছে না।

 

হঠাত্ ভীষণ এক চিত্কার বেরিয়ে এল ফ্রেডির গলা থেকে। টান মেরে এক ঝটকায় হাতটা মুক্ত করল সে, ভয়ংকর গতিতে ওটা নামিয়ে আনল বুড়ো লোকটির খুলির ওপর। আশ্চর্য নীরব হয়ে গেছে রান্নাঘরটা। মেঝেতে চিত হয়ে পড়ে আছেন মি. ওয়েলস। নিথর, প্রাণহীন। ফ্রেডি হাতের ফ্রাইপ্যানটার দিকে তাকাল। ওর বরফের মতো ঠান্ডা চোখে নিষ্ঠুর এক টুকরো হাসি ফুটে উঠেছে। ও এখন জানে মি. ওয়েলস অবশেষে সফল হয়েছেন। তার জন্য একটি নতুন শখ সৃষ্টি করে দিয়ে গেছেন তিনি—একটি ভয়ংকর শখ।


 

Comment As:

Comment (0)